
অনলাইন ডেস্ক: মাসিক ভাতা ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করার দাবিতে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের বেসরকারি ট্রেইনি চিকিৎসকরা সারা দেশের সরকারি হাসপাতালে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি পালন করছেন।
রোববার এই দাবিতে শহিদ মিনারে গণ-অনশন শুরু করেছেন তারা। হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের স্থান সংকুলান হচ্ছে না। দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ। প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। গতকাল এ বছর দেশে এক দিনে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ও আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির রেকর্ড হওয়ার তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।
গত ২৪ ঘণ্টায় ৮৩৬ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। আর এক দিনে মৃত্যু হয়েছে ৬ জনের। ডেঙ্গুর এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে চিকিৎসাসেবা ফেলে কর্মবিরতিতে গেছেন বেসরকারি ট্রেইনি চিকিৎসকরা। এতে ব্যাহত হচ্ছে ডেঙ্গু চিকিৎসা, ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগী ও স্বজনরা। রোগী ফেলে চিকিৎসকদের এ ধরনের আন্দোলন কতটা যৌক্তিক এমন প্রশ্ন উঠেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও প্রবীণ চিকিৎসকরা বলছেন, স্নাতকোত্তর বেসরকারি ট্রেইনি চিকিৎসকদের দাবিটা যৌক্তিক। কিন্তু রোগীদের জিম্মি করে কর্মবিরতি করা উচিত নয়।
স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে ৮৩৬ জন নতুন রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় ৫১৬ জন ও ঢাকার বাইরে ৩২০ জন। বর্তমানে সারা দেশে ২ হাজার ৭৫০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ৯৬৮ জন ও ঢাকার বাইরে ৭৮২ জন।
২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৯ জুলাই জুন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ১২ হাজার ৯৫৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। আর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৭৩ জন।
এডিস মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে গত বছর ৬২ হাজার ৩৮২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে রেকর্ড ২৮১ জনের মৃত্যু হয়। এর আগে ২০১৯ সালে দেশের ৬৪ জেলায় ১ লাখের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়, যা এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ। সরকারি হিসাবে সে বছর মৃত্যু হয়েছিল ১৬৪ জনের।
আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, সারা দেশেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ডেঙ্গু রোগীদের অনেকেরই হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে মেঝে ও বারান্দায় ঠাঁই হয়েছে। রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে চিকিৎসকরা হিমশিম খাচ্ছেন। এর মধ্যে চিকিৎসকের কর্মবিরতি হাসপাতালে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪টি মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি করা রোগীদের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই ডেঙ্গু রোগী। এই হাসপাতালে ২২৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছে। এই ৪ ওয়ার্ডে ৪৬০ জন ট্রেইনি চিকিৎসক প্রতিদিন দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মোট ট্রেইনি চিকিৎসক রয়েছেন দেড় হাজারের মতো। এসব চিকিৎসক ৭০ শতাংশ রোগীর চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। এত বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক ছাড়া হাসপাতালে এক ধরনের অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং মুগদা জেনারেল হাসপাতাল ঘুরে কোথাও একজনও ট্রেইনি চিকিৎসকের দেখা মেলেনি। ঢামেক হাসপাতালের অধিকাংশ ওয়ার্ডে রোগীরা চিকিৎসকের অপেক্ষায় ছিলেন।
একাধিক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ট্রেইনি চিকিৎসকরা কাজ বন্ধ রাখায় রোগীদের স্বাভাবিক সেবায় ব্যাঘাত ঘটছে। স্নাতকোত্তর ইন্টার্ন চিকিৎসকদের উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য ২-৫ বছরের জন্য একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসা ক্ষেত্রে আরও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হয়। উপস্থিত চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে সরাসরি রোগীর সেবা দেওয়া, বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করা এবং তাদের ক্লিনিকাল দক্ষতা অর্জন করতে হয়। তাদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস করার অনুমতি দেওয়া হয় না এবং তাদের সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। সপ্তাহে ৩-৪ দিন সরকারি চিকিৎসকরা শুধু হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। বাকি সময় সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার দায়িত্ব এই ট্রেইনি চিকিৎসকদের। বেসরকারি ট্রেইনি চিকিৎসক ছাড়া হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম অনেকটাই অচল হয়ে পড়েছে।
পোস্ট গ্র্যাজুয়েট প্রাইভেট ট্রেইনি ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন (পিজিপিটিডিএ) কেন্দ্রীয় শাহদ মিনানে গণ-অনশন কর্মসূচি পালন করছে। আয়োজকরা জানান, বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রায় সাড়ে ৮ হাজার চিকিৎসক আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন।
অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. জাবির হোসেন বলেন, আমরা গত ৬ মাস ধরে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ এবং পেশাদার সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করছি। কিন্তু আমরা কোনো সন্তোষজনক সাড়া পাইনি। সরকার আমাদের ভাতা বাড়ানোর গেজেট জারি না করা পর্যন্ত আমরা এ কর্মসূচি চালিয়ে যাব।
পোস্ট গ্র্যাজুয়েট বেসরকারি ট্রেইনি চিকিৎসকদের ভাতা ২০ হাজার করা হয়েছিল, তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য ছিলেন অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান।
তিনি সময়ের আলোকে বলেন, স্নাতকোত্তর বেসরকারি ট্রেইনি চিকিৎসকদের ভাতা বাড়ানোর দাবিটা যৌক্তিক। কিন্তু রোগীদের জিম্মি করে কর্মবিরতি করা উচিত নয়। সরকারের সঙ্গে আলোচনা-সমঝোতা করে দাবি বাস্তবায়ন করা যেত।
অধ্যাপক কামরুল বলেন, ট্রেইনি চিকিৎসকদের কাজ বন্ধ করায় তাদের লেখাপাড়ার ক্ষতি হচ্ছে। চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি বলেন, অনিয়মিতভাবে স্নাতকোত্তর ট্রেইনি চিকিৎসকদের ১০ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হতো। এর আগে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট বেসরকারি ট্রেইনি চিকিৎসকদের কোনো ভাতা ছিল না। নিজের টাকা দিয়ে পড়াশোনা করতে হতো। এরপরে ভাতা চালু হলেও তা ছিল অনিয়মিত। পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে ভাতা ২০ হাজার টাকা করা হয়। দেশে ভয়াবহ ডেঙ্গু পরিস্থিতির মধ্যে রোগীদের জিম্মি করে কর্মবিরতি উচিত নয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. নাজমুল হক বলেন, আমাদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ট্রেইনি চিকিৎসক রয়েছেন। তাই আমরা স্বাভাবিক রোগীর সেবা বজায় রাখতে সমস্যায় পড়েছি, বিশেষ করে যখন শহরে ডেঙ্গুর প্রকোপ রয়েছে। এ সময় কর্মবিরতিতে যাওয়া চিকিৎসকদের ঠিক হয়নি।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে বলে তিনি জানান।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, তারা বেতন বাড়ানো দাবি করতেই পারেন। তবে কর্মবিরত পালন করা ঠিক হয়নি। শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা যেসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন, সেসব প্রতিষ্ঠানে তহবিল বরাদ্দের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে জানান।
তিনি বলেন, রোগীদের জিম্মি করে আন্দোলন না করে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে চিকিৎসকরা তাদের দাবি জানাতে পারতেন।
Leave a Reply