
শাহজাহান বিশ্বাস:সরকারি নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও মানিকগঞ্জের পদ্মা-যমুনায় চলছে মা ইলিশ নিধন। একদিকে চলছে প্রশানের অভিযান, অপরদিকে চলছে মা-ইলিশ নিধন। এ সময়ে চরাঞ্চলে বসবাসকারী একশ্রেণীর মৌসুমী মৎস্য শিকারীরা প্রশাসনের নজর এড়িয়ে চুরি করে রাত-দিন নদীতে জাল ফেলে ডিমওয়ালা মা ইলিশ ধরছে। এসব মাছ নিজ বাড়িসহ নানা স্থানে দেশীয় পদ্ধতিতে মৌজুত করে রাখছে এসব মৎস্য শিকারীরা। মৌজুতকৃত এ মাছ অভিযানের পর বেশী দামে বিক্রি করবে বলে জানিয়েছেন স্থানীরা।
সরজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রশাসনিক ব্যাপক অভিযান সত্তেও থামানো যাচ্ছেনা মানিকগঞ্জের পদ্মা-যমুনায় মা ইলিশ নিধন। অসাধু ইলিশ শিকারীরা প্রতিবছরের মতো এবারও তারা প্রশাসনের অভিযানের অগ্রিম তথ্য পাওয়ার জন্য তাদের নির্ধারিত স্থানে লোকজন সেট করে রেখেছে। তাদের মাধ্যমে খবর পেয়ে সর্তক অবস্থানে থেকে চুরি করে মাছ ধরছে চোরা মৎস্য শিকারীরা। মানিকগঞ্জের শিবালয়-হরিরামপুর ও দৌলতপুরের পদ্মা-যমুনা অংশে ইলিশ নিধন ও বিক্রির মহোৎসব চলছে। স্থানীয় সোর্সের মাধ্যমে মৎস্য শিকারীরা আগেই খবর পেয়ে যাচ্ছে বিশেষ অভিযানের। এই সুযোগে মৎস্য শিকারী ও ক্রেতা-বিক্রেতারা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তারা চোরা শিকারীদের যন্ত্রনায় অতিষ্ট হয়ে খেই হারিয়ে ফেলছেন।

জেলা মৎস্য অফিসার সাইফুর রহমান জানিয়েছেন, জেলায় গত ১২ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত ৮০টি অভিযান পরিচালনা করে ১৮ টি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ৫.৪৫ লক্ষ মিটার কারেন্ট জাল ধ্বংশ করা হয়েছে। যার মূল্য ১০১.৭৩লক্ষ টাকা। একই সাথে .৪৪ মেট্রিকটন ইলিশ মাছ জব্দ করে বিভিন্ন মাদ্রাসা ও আশ্রয়ন প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। ১ লক্ষ ২৪ হাজার টাকা জরিমানা করে এবং ৩৯টি মামলা করে ১৫জনকে জেলে প্রেরণ করে অন্যান্যদের জরিমানা করা হয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষে অধিকাংশ অভিযানে পরিত্যাক্ত জাল, নৌকা ও ইলিশ জব্দের কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলে অনেকেই বিরুপ মন্তব্য করেছেন। তারা আরো বলেছেন, মা ইলিশ নিধন রোধকল্পে আজ পর্যন্ত যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়নি। এর মধ্যে শিবালয়ের আরিচা ঘাটে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে কয়েকটি বরফ কল। এ নিয়েও বিভিন্ন মহলে নানা গুঞ্জনের সৃষ্ঠি হয়েছে। বিগত দিনের অভিযানে জব্দকৃত জাল-নৌকা ধ্বংস করাসহ জব্দকৃত ইলিশ স্থানীয় দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, শিবালয়, দৌলতপুর ও হরিরামপুর উপজেলার প্রায় ৬০ কিলোমিটার বিস্তৃত পদ্মা-যমুনা বক্ষে প্রত্যহ বিপুল সংখ্যক ইঞ্জিনচালিত নৌকাযোগে দিনে ও রাতে অবৈধ কারেন্ট জালের মাধ্যমে নির্বিঘ্নে ইলিশ শিকারের উৎসব চলছে। এই কাজে হালদার সম্প্রদায়ের প্রকৃত জেলেরা নিরব থাকলেও মৌসুমী জেলেরা তৎপর রয়েছে। ধৃত ইলিশ ক্রয়ে আগ্রহী একশ্রেণির লোকজন নদী পাড়ে নিয়মিত ভিড় জমাচ্ছেন। শিবালয়ের আলোকদিয়া চরে প্রতি কেজি ইলিশ আট’শ থেকে এক হাজার টাকা ধরে বিক্রি হচ্ছে। সব মিলিয়ে এই অঞ্চলে ইলিশ শিকারী ও সুবিধাভোগীদের যেন মহোৎসব চলছে।
যমুনা নদী সিকস্তি শিবালয়ের তেওতার আলোকদিয়া গ্রামের হাসেম আলী অভিযোগের সুরে বলেন, ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে নদীতে একদিকে চলছে ইলিশ নিধন অপরদিকে চলছে প্রশাসনের অভিযান।
তিনি আরো বলেছেন, নাম মাত্র এ অভিযানে জাল-নৌকা জব্দ করা হলেও শিকারীরা থাকছে অধরা। এই অবস্থায় অন্যান্যরাও ইলিশ শিকারে আগ্রহ দেখাচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরো একটি সুত্র জানিয়েছেন, গত প্রজনন মৌসুমে মা’ইলিশ রক্ষায় শিবালয় উপজেলার পদ্মা-যমুনার অংশে প্রশাসনের অভিযানে আড়াই’শর অধিক জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড ও লাখ-লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। এবার নদীতে একই অবস্থা চললেও মৎস্য অধিদপ্তরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
চরাঞ্চলে বসবাসকারী আব্দুল মোতালেব,মওলা,সুরুয,আওয়াল,আলালসহ শতাধিক বাসিন্দার ধারনা চোরা মৎস্য শিকারীদের সাথে মৎস্য অফিসের কিছু অসাধু সদস্যর সহযোগীতা থাকায় ঢিলেঢালা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অবশ্য তাদের পক্ষ হতে বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
অপরদিকে শিবালয়ের হানিফ এর ছেলে ফরহাদ,কোখাদীর সামছু মোল্লার ছেলে নিজাম,ইছাক,রুস্তম এবং একই গ্রামের নিজামের ছেলে আসলাম, আনুলিয়ার সালামের ছেলে সায়েম এবং ঢালারচরের খাসচর গ্রামের আখের শেখের ছেলে জালাল কারেন্টজাল এর ব্যাবসা করে আসছে দীর্ঘদিন যাবত। তারা এখনও প্রকাশ্য এবং নিয়মিত জালের ব্যাবসা করলেও তাদের বিরুদ্ধে তেমন কোন ব্যাবস্থা গ্রহন করা হয়েছে বলে দেখা যায়নি। এসব ব্যাপারে কথা বললে স্থানিয় প্রশাসন জাল ব্যাবসায়ীদের বিরুদ্ধে এ্যাকশন নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন।
এদিকে গত ১৯ অক্টোবর জেলা প্রশাসক রেহেনা আকতার মা ইলিশ নিধন রোধকল্পে অভিযান পরিচালনা করেছেন এবং গত ২১ অক্টোবর অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছেন মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক সৈয়দ মো. আলমগীর ।
এব্যাপারে শিবালয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. জাহিদুর রহমান বলেন, আমরা প্রতিদিনই অভিযান পরিচালনা করছি জেল জরিমানা করছি। জনস্বার্থে আমাদের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।
Leave a Reply