
অনলাইন ডেস্ক: সিরাজুল ইসলাম ঢাকায় রিকশা ও অটোরিকশা চালান। স্ত্রী, দুই ছেলে এবং এক মেয়েকে নিয়ে ছিল তার সংসার। কয়েক দিন ধরেই তার স্ত্রী সালমা বেগমের জ্বরের পাশাপাশি শরীর অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে। মেয়েও অসুস্থ হয়। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসায় ভালো না হওয়ায় দুজন দশমিনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যায়। সেখানে তাদের ডেঙ্গু ধরা পড়ে। স্ত্রী এবং একমাত্র মেয়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার খবর পেয়ে গত শনিবারই সিরাজুল ইসলাম বাড়িতে চলে যান।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দুজনকেই বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে মা-মেয়ের মৃত্যু হয়। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সালমা বেগমের (৪০) মৃত্যু হয়। এর ১২ ঘণ্টা পর গত বুধবার ভোরে মারা যায় তার মেয়ে সাদিয়া (১২)। একই সঙ্গে পারিবারিক কবরস্থানে মা-মেয়ের মরদেহ দাফন করা হয়। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রতিদিনই ডেঙ্গুতে এভাবে কাউকে না কাউকে স্বজন হারাতে হচ্ছে।
বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি হয়। বর্ষা শেষ হয়েছে। শীত এসে গেছে। তবু ডেঙ্গু উদ্বেগজনক পর্যায়েই রয়ে গেছে। প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। ডেঙ্গুতে নিয়মিত মৃত্যুও হচ্ছে। শুক্রবার ডেঙ্গুতে দেশে আরও ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৬০ জনে। আগের দিন গত বৃহস্পতিবার ডেঙ্গুতে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নীরবে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের ডেঙ্গুবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গতকাল নতুন করে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৩৩৩ জন। তাদের মধ্যে ঢাকায় ২৯৮ জন ও ঢাকার বাইরে ১ হাজার ৩৫ জন। প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডেঙ্গুর নতুন ভয় গ্রামে। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে এ দেশে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়।
এরপর ২০০০ সালে প্রথম বড় আকারে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ডেঙ্গু ছিল মূলত ঢাকা শহরকেন্দ্রিক। এরপর প্রতিবছর কমবেশি ডেঙ্গুর সংক্রমণ দেখা দিতে থাকে। ২০১৯ সালে বড় বড় শহরের পাশাপাশি কয়েকটি গ্রামেও ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। এখন পর্যন্ত ২ লাখ ৮৮ হাজার ৫৭২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে ঢাকায় ১ লাখ ২ হাজার ৮৮৯ জন ও ঢাকার বাইরে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৬৮৩ জন।
গতকাল মারা যাওয়া ১১ জনের মধ্যে ৩ জন ঢাকার। আর ঢাকার বাইরের বাসিন্দা ৮ জন। এখন পর্যন্ত দেশে মারা যাওয়া ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে ঢাকার ৮৫৭ এবং ঢাকার বাইরের ৬০৩ জন। উপকূলের জেলাগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপ নতুন ঝুঁকি বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা।
এ বছর ৬৪ জেলাতেই ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে, বহু গ্রামের মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। এর অর্থ সারা দেশে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা আছে। মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মকাণ্ড সাধারণত বড় বড় শহরে চোখে পড়ে। গ্রামে সেই কার্যক্রম নেই। গ্রামের মানুষের করণীয় সম্পর্কে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো বার্তাও নেই। গ্রামে তাই ডেঙ্গুর ঝুঁকি থেকেই যাবে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. আবদুল আলীম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে এডিস মশা বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। নগরকেন্দ্রিক এডিস মশার প্রজননকাল জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর। কিন্তু এডিশ মশার এখন সারা দেশে, সারা বছর প্রার্দুভাব দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মশক নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষকে সচেতন করার কাজটি আর সেভাবে হচ্ছে না। কিন্তু চেষ্টাটা ধরে রাখতে হবে। এডিস ও কিউলেক্স মশা নিধনের জন্য আলাদা কর্মসূচি রাখতে হবে। স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং শিক্ষাসহ সব বিভাগের মধ্যে সমন্বিত একটি উদ্যোগ দরকার, যা এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান সময়ের আলোকে বলেন, এটি মশাবাহিত রোগ। ঘর থেকেই আমরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছি। প্রথম আমার ঘর আমাকে নিরাপদে রাখতে হবে।
তিনি বলেন, মশার চরিত্র পাল্টেছে। বর্ষায় শহরকেন্দ্রিক এডিস মশা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ডেঙ্গুর ধরন পাল্টেছে। অনেকে দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই অনেকে শক সিনড্রোমে মারা যাচ্ছে। নীরবে ভয়ংকর হয়ে উঠছে ডেঙ্গু।
অধ্যাপক কামরুল আরও বলেন, সচেতনতা সৃষ্টি সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, স্থানীয় সরকার, জনগণ সবার কাজ। ডেঙ্গু নিয়ে সচেতনতায় গণমাধ্যম ভালো ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি সামাজিক শক্তিরও দায়িত্ব রয়েছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং সিটি করপোরেশনের কাজ দৃশ্যমান করার তাগিদ দেন তিনি।সুত্র: সময়ের আলো
Leave a Reply