
অনলাইন ডেস্ক: ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান, আফ্রিকা অঞ্চলে কর্মরত বাংলাদেশি দূতদের নির্দেশনা, আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার এই সময়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে বৈঠক-এই চার ইস্যুকে সামনে রেখে আজ মঙ্গলবার দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এই সফরে ভারত, চীন, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, মোজাম্বিকসহ একাধিক দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক হবে প্রধানমন্ত্রীর। ঢাকা আগেই আভাস পেয়েছে যে ভূ-রাজনৈতিক কারণে এই সফরে ব্রিকসের সদস্য পদ পাচ্ছে না, তবে এই বিষয়ে তাড়াহুড়াও করতে চায় না ঢাকা। ব্রিকস দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক রাষ্ট্র ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার একটি জোট।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি মাতামেলা সাইরিল রামাফোসার আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন। বৈশ্বিক এই সম্মেলনে যোগ দিয়ে এই সফরকে বহুমুখী কাজে লাগাতে চান প্রধানমন্ত্রী। সামনে দেশের জাতীয় নির্বাচন, নির্বাচনের আগে এমন সফর হওয়ার সুযোগ নেই, যেখানে একাধিক দেশের সরকারপ্রধানকে পাওয়া যাবে। তাই এই সফরের দিকে বাড়তি নজর রয়েছে। এই সম্মেলনের সাইড লাইনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি মাতামেলা সাইরিল রামাফোসা, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইস ললা ডা সিলভা এবং মোজাম্বিকের প্রেসিডেন্ট ফিলিপে ন্যুসিসহ বিশ্বের একাধিক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এসব বৈঠকে স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন গুরুত্ব পাবে। কয়েক মাস আগে থেকেই চীন চাচ্ছিল দ্বিপক্ষীয় এবং আঞ্চলিক ইস্যুতে তাদের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক অনুষ্ঠিত হোক। প্রধানমন্ত্রীকে চীন সফরেরও আমন্ত্রণ জানিয়েছিল দেশটি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ব্যস্ততার কারণে তা আর হয়নি। তবে এবার জোহানেসবার্গে চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হবে। ওই বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে চীনের ঋণের সুদ কমানো, বাস্তবায়নাধীন একাধিক মেগা প্রকল্প উন্নয়ন, চীনের সঙ্গে চুক্তি করা ২৭ প্রকল্পের অগ্রগতি এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলাপ হবে।
এর আগে গত ২০১৯ সালের জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরে চীনের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সর্বশেষ বৈঠক হয়। এক কূটনীতিক জানান যে, এই সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠক হবে। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জোহানেসবার্গের বৈঠকটি শুধু আনুষ্ঠানিকতা হবে, মূল বৈঠকটি হবে আগামী মাসে নয়াদিল্লিতে।
এই সফরে আফ্রিকার দেশগুলোতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতদের অংশগ্রহণে ‘আঞ্চলিক দূত সম্মেলন’ এ অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সম্মেলনে দূতদের করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি দূতরা কাজ করতে গিয়ে যেসব সমস্যা মোকাবিলা করেন সেগুলোর সমাধান দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া এই সফরে আফ্রিকা অঞ্চলের দেশগুলোর (সেখানে ৫৫টি রাষ্ট্র রয়েছে) সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে নজর দেবেন প্রধানমন্ত্রী। ব্যবসা-বাণিজ্যসহ আফ্রিকা অঞ্চলের একাধিক খাতে প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে এই সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগাতে চায় সরকার।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কাল ২৩ আগস্ট দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) কর্তৃক যৌথভাবে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড বিজনেস সামিটে’ যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেবেন। অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী আফ্রিকার দেশগুলোতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতদের অংশগ্রহণে আয়োজিত ‘আঞ্চলিক দূত সম্মেলন’ এ অংশ নেবেন। একই দিন দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতিসহ ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাতের কথা রয়েছে। একই দিন সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী ব্রিকসের বর্তমান চেয়ার এবং দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় যোগদান করবেন।
২৪ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী ‘ব্রিকস-আফ্রিকা আউটরিচ অ্যান্ড ব্রিকস প্লাস ডায়লগ’ শীর্ষক ব্রিকসের শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করবেন। এ ডায়লগে ব্রিকসের নিউ ডেভেলপ ব্যাংকের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেবেন। বিশ্বের প্রায় ৭০টি দেশের প্রতিনিধিরা এখানে উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে। একই দিন সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। সফর শেষে ২৬ আগস্ট সকালে প্রধানমন্ত্রী জোহানেসবার্গ থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেবেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন সোমবার এই প্রতিবেদককে বলেন, ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্টের সাক্ষাতের সম্ভবনা আছে, তবে এখনও সময় চূড়ান্ত হয়নি। শেখ হাসিনা-শি জিনপিং বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে আলোচনার শেষ নেই। চীন আমাদের উন্নয়ন সহযোগী। আমরা অনেকগুলো প্রজেক্ট সই করেছি, এমওইউ সই করেছি, প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলারের সই। আর প্রাইভেটে ১৩ মিলিয়ন। তার থেকে ৮ বছরে ৪ বিলিয়ন ডলার এ পর্যন্ত পেয়েছি, সেগুলো যেন ত্বরান্বিত হয়, সেটা আলোচনা হতে পারে। এগুলো একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। আমরা ঋণের সুদের হার কম চাই। এটার ওপর আলোচনা হবে। দুনিয়াব্যাপী তাদের ঋণের সুদের হার বেড়ে গেছে। আমরা বলব, সস্তায় বিবেচনা করলে ভালো হয়। জলবায়ু ইস্যু থাকবে, আমাদের নিয়মিত অভিবাসন থাকে, আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ চাই। বাণিজ্য বাড়াতে চাই। চায়না বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য আমাদের অনেক ছাড় দিয়েছে। তবুও বাণিজ্য একপেশে হয়ে গেছে। আমরা বলব বাণিজ্য আরও বাড়াও, বিনিয়োগ করো।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নয়া দিল্লিতে আলোচনার জন্য রাজি হয়েছেন। তাই জোহানেসবার্গে ব্রিকস সম্মেলনে ওনার (মোদি) সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না। কারণ সেপ্টেম্বরে তো দেখা হবেই।
আফ্রিকা অঞ্চলের সম্ভাবনাকে বাংলাদেশ কীভাবে কাজে লাগাচ্ছে, এই বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম এই প্রতিবেদককে বলেন, আফ্রিকার দুটি দেশে ওষুধ শিল্প প্রতিষ্ঠা করেছে বাংলাদেশ। যার একটা কেনিয়াতে, অন্যটা রুয়ান্ডাতে। এই অঞ্চলের দেশগুলোর আমাদের সম্পর্ক বেড়ে চলেছে, যা আমরা আরও বাড়াতে চাই। এই অঞ্চলের সঙ্গে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং-এ আমাদের অগ্রগতি হয়েছে। আমরা একাধিক রাষ্ট্রের সঙ্গে কৃষি-সংক্রান্ত সমঝোতা সই করেছি। তানজানিয়াসহ দুটি দেশে একাধিক কন্ট্রাক্ট ফার্ম নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
Leave a Reply