
অনলাইন ডেস্ক: গত কয়েক দিনের অব্যাহত বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নদ-নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করলেও এখন কমতে শুরু করেছে। তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনার পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও চরাঞ্চলের নিম্নভূমি বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে।
দেশের ৫ জেলা রংপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম এবং সুনামগঞ্জে কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। দুর্ভোগে পড়েছেন নদ-নদী তীরবর্তী চরাঞ্চলের নিম্নআয়ের মানুষ। এদিকে পানি নিয়ন্ত্রণে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রেখেছে কর্তৃপক্ষ। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
রংপুর : উজানে ঢল ও ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি সকালে বিপদসীমা ছুঁইছুঁই করলেও গতকাল বিকালে
পানি কমতে শুরু করেছে। পানি নিয়ন্ত্রণে ব্যারেজের ৪৪টি গেট খুলে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এক দিন পর আবারও তিস্তা পানি হুহু করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে চরাঞ্চলের ৩ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বুধবার বেলা ৩টার দিকে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের পয়েন্টে তিস্তার পানিপ্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে ৫১ দশমিক ৯৫ সেন্টিমিটার, যা বিপদসীমার দশমিক ২০ সেন্টিমিটার নিচে প্রবাহিত হচ্ছে। (স্বাভাবিক ৫২ দশমিক ১৫ সেন্টিমিটার)। বুধবার ভোর ৬টা থেকে তিস্তার পানি বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসফাউদ্দৌলা বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় লালমনিরহাটের ৫ উপজেলার নদী-তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরের মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছে। হাতীবান্ধা উপজেলার ফকিরপাড়া ইউনিয়নের সানিয়াজান নদী পার হতে গিয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থী রাজু (১৮) নিখোঁজ রয়েছে। সে উপজেলার দালালপাড়া গ্রামের নুর ইসলামের ছেলে।
জানা গেছে, তিস্তা ও ধরলার পানি বৃদ্ধিতে জেলার পাটগ্রামের দহগ্রাম, হাতীবান্ধার গড্ডিমারী, দোয়ানী, সানিয়াজান ইউনিয়নের নিজ শেখ সুন্দর, সিঙ্গামারি ইউনিয়নের ধুবনী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া, ডাউয়াবাড়ী, কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী, শৈইলমারী, নোহালী, চর বৈরাতি, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা, পলাশী ও সদর উপজেলার ফলিমারীর চর খুনিয়াগাছ, রাজপুর, গোকু-া ইউনিয়নের তিস্তা নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করায় প্রায় তিন হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে।
নীলফামারী : পানি কমতে শুরু করায় নীলফামারীর ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার নদীপাড়ে চর এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙন আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা। গত কয়েক দিনে নদী অববাহিকার নিম্নাঞ্চলগুলোতে এরই মধ্যে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। এখনও ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ না করলেও তলিয়ে গেছে এসব এলাকার আবাদি জমি ক্ষেত। চরাঞ্চলের মানুষের ফসলের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা। হঠাৎ পানি বাড়ার ফলে গবাদি পশুপাখির খাবার নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন তারা। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসফাউদ্দৌলা বলেন, কয়েক দিন ধরে তিস্তার পানি বাড়া-কমার মধ্যেই রয়েছে। আজ সকালে তিস্তার পানি বিপদসীমার ৪০ সেন্টিমিটার ও বিকালে ৬০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেট খুলে দিয়ে পানি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
গাইবান্ধা : বৃষ্টি কমে আসায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে আশা করছে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। গত কয়েক দিন ধরে নদ-নদীগুলোর পানি বাড়তে থাকলেও বৃষ্টি কমে যাওয়ায় পানিও কমতে শুরু করে। আপাতত জেলায় বন্যার শঙ্কা নেই। এদিকে জেলার নদ-নদীগুলোতে পানি কমার সঙ্গে শুরু হয়েছে ভাঙন। ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা-যমুনা বেষ্টিত জেলার সাঘাটা, ফুলছড়ি, গাইবান্ধা সদর ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার অন্তত ১২টি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে বুধবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত জেলার সব নদ-নদীর পানি কমেছে।
বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় ব্রহ্মপুত্র ১৯ দশমিক ০২ সেন্টিমিটার, তিস্তা ২৭ দশমিক ৮৫ সেন্টিমিটার, করতোয়া ১৪ দশমিক ৪৫ সেন্টিমিটার ও ঘাঘট নদীর পানি ১৯ দশমিক ৯৯ সেন্টিমিটার স্কেলে প্রবাহিত হচ্ছিল। যা আগের তুলনায় অনেক কম। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাফিজুল হক জানান, নদ-নদীগুলোর পানি কমতে শুরু করেছে। বন্যার পূর্ব প্রস্তুতির জন্য কাজ করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো সংস্কার করা হচ্ছে।
কুড়িগ্রাম : ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমারসহ সবকটি নদ-নদীর পনি অব্যাহত রয়েছে। তবে এসব নদ-নদীর পানি ধীর গতিতে বৃদ্ধি পাওয়ায় এখনও বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে করে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার উলিপুর ও সদর উপজেলার মুসার চর, পূর্ববালাডোবার চর, ফকিরের চর, পোড়ার চরসহ কয়েকটি চরের ঘরবাড়িতে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। এসব চরে বসবাসকারী পরিবারগুলো পড়েছে চরম দুর্ভোগে। অনেকেই দিনের বেলা ঘরবাড়ি ছেড়ে উঁচু জায়গায় অবস্থান করলেও কোনো কোনো পরিবারের দিন কাটছে নৌকায়। তবে এ পরিবারগুলো রাতের বেলা নিজ ঘরের উঁচু মাচানে অবস্থান করছেন। বন্যাকবলিত এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানি ও শুকনো খাবারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বুধবার কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিস সূত্রে জানা গেছে, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি নুনখাওয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ২২ দশমিক ৫৫ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ২২ দশমিক ৬৫ সেন্টিমিটার, ধরলা নদীর পানি সদর পয়েন্টে বিপদসীমার ২২৫ দশমিক ৪৯ সেন্টিমিটার ও দুধকুমার নদীর পানি জেলার ভূরুঙ্গামারীর পাটেশ্বরী পয়েন্টে বিপদসীমার ২৯ দশমিক ৫০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, আগামী ২২ ও ২৩ জুন প্রধান নদ-নদীগুলোর পনি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমা অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি বন্যা হওয়ার আশঙ্কা নেই বলে জানায় পানি উন্নয়ন বোর্ড।
সুনামগঞ্জ : মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে বুধবার দুপুর পর্যন্ত বৃষ্টিপাত না থাকলেও সুরমা নদীর ছাতক পয়েন্টে বিপদসীমার ৯০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। সুরমা নদীর সুনামগঞ্জের ষোলঘর পয়েন্টে মঙ্গলবার রাত ৯টা থেকে বুধবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৯ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। সুরমা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে সুনামগঞ্জ সদর, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার ও ছাতক উপজেলা নিম্নাঞ্চলে পানির চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শামসুদ্দোহা। তিনি বলেন, ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত অব্যাহত আছে, ফলে সুরমা নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামী দুদিন পানি কিছুটা বাড়বে বলে জানান তিনি। এদিকে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় নামছে পাহাড়ি ঢল। এতে করে পানি প্রবেশ করছে সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে। ডুবে গেছে সদর ও ছাতক উপজেলার বেশ কিছু গ্রামীণ সড়ক।
সুনামগঞ্জের নদ-নদী ও হাওরগুলো ফুলে উঠছে। ঢলের পানি হু হু করে ঢুকছে খাল-বিল-হাওরে। জেলার সবকটি হাওর এখন পানিতে ভরপুর। বন্যার তেমন শঙ্কা না থাকলেও এখন জেলার টাঙ্গুয়ার হাওর, মাটিয়ান হাওরসহ সব হাওরে পানিতে টইটম্বুর। এভাবে দুয়েক দিন পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে বন্যার কবলে পড়বে সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চল। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, সুনামগঞ্জে নদীর পানি বেড়ে বুধবার সুরমা নদীর ছাতক পয়েন্টে বিপদসীমার ৯০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এ ছাড়া সুরমা নদীর পানি বেড়েছে সুনামগঞ্জে পৌর শহরের ষোলঘর পয়েন্টেও। সুরমা নদীর ষোলঘর পয়েন্টের বিপদসীমার মাত্র ৪৬ সেন্টিমিটার দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ৭৫ মিলিমিটার। নদীতে এখনও পানি বাড়ছে।
Leave a Reply