
অনলাইন ডেস্ক: রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে গত কয়েক দিন ধরেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পশু আসা শুরু হয়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে পশুর হাটের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে আজ রোববার।
নির্ধারিত সময়ের আগেই ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) নির্দেশনাকে উপেক্ষা করে রাজধানীতে ১৯টি পশুর হাট বসানো হয়েছে। এমনকি নির্ধারিত স্থানের বাইরে পাড়া-মহল্লা ও সড়কের মধ্যেও খুঁটি দিয়ে পশু বাঁধার জায়গা প্রস্তুত করা হয়েছে। গতকাল পশুর হাটের সর্বশেষ পরিস্থিতি ৯টি হাট নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক এসএম মিন্টু, গোলাম মোস্তফা, শাকিল আহমেদ ও আল ইমরান
উত্তরার দিয়াবাড়ী : গতকাল ১০টি গরু নিয়ে এসেছেন আহমেদ আলী। তার ১০টি গরুর মধ্যে প্রতিটির লাইভ ওজন প্রায় ৪০০ কেজি করে। তিনি জানান, পাঁচটি গরু এলাকা থেকে কিনেছেন। বাকি পাঁচটি নিজের খামারেই মোটাতাজা করেছেন।
মূল্য কেমন হতে পারে প্রতিটি গরুর-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কেবল হাটে প্রবেশ করেছি। বাজার বুঝে মূল্য নির্ধারণ করা হবে। তবে টার্গেট রয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকায় একেকটি গরু তিনি বিক্রি করবেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে একই হাটে ১ নম্বর কাউন্টারের উত্তর দিকে কথা হয় খন্দকার অ্যাগ্রোর মালিক আরিফ মাহমুদের সঙ্গে। তিনি বলেন, কেবল একটি গরু বিক্রি করেছি ১ লাখ ৮০ হাজার টাকায়। লাইভ ওজন প্রায় ৫১০ কেজি। তবে এই হাটে গরু বিক্রিতে এগিয়ে রয়েছেন বুশরা অর্গানিক অ্যাগ্রোর মালিক আলমগীর হোসেন। তিনি দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত গরু বিক্রি করেছেন ৬০টি। আরও ৭০টির মতো গরু রয়েছে তার।
কাওলা : দুপুর ১টার দিকে দক্ষিণখানের কাওলাহাটে সরেজমিন দেখা গেছে তুলনামূলকভাবে গরু কম। তবে ওই সময়ে গরুভর্তি ১০টি ট্রাক দাঁড়িয়েছিল হাটের সামনেই। আড়াই মণ ওজনের গরুর মূল্য বেপারিরা হাঁকছেন দেড় লাখ টাকা। আশকোনা থেকে আসা হযরত আলী নামে একজন ক্রেতা বলেন, যেসব গরু গত বছর ৮০ হাজার টাকায় নিয়েছি ওই মাপের গরু হাটে দাম চায় দেড় লাখ টাকা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৪৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আনিছুর রহমান নাঈম বলেন, ক্রেতাদের এত বেশি চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। আজ (শনিবার) রাতেই হাট ভরে যাবে গরুতে। এখনও তেমন জমজমাট হয়নি। রোববার থেকে ক্রেতারা কম মূল্যেই গরু কিনতে পারবেন।
আফতাবনগর : গত কুরবানির ঈদে আফতাবনগর হাট নিয়ে হট্টগোল হওয়ায় আদালতে রিট আবেদন করেন দুই পক্ষ। এ বছর সিটি করপোরেশন যখন হাট ইজারার জন্য দরপত্র আহ্বান করেন তখনও তালিকায় ছিল না বাড্ডার আফতাবনগর হাট। শেষ বেলায় এসে উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় এবার পশুর হাট বসানো হয়। তবে কুরবানির বাকি আর মাত্র তিন দিন। এরই মধ্যে সব কাজ সম্পন্ন করে গরু আসা শুরু করেছে হাটটিতে। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা এখান থেকেই গরু কিনবেন তারা। শনিবার দুপুরে কথা হয় কুষ্টিয়ার গরুর বেপারি মো. শাহ আলমের সঙ্গে।
তিনি বলেন, আমি মাঝারি সাইজের গরু এনেছি ৩৫টি। বিকাল পর্যন্ত বিক্রি করেছি মাত্র একটি। দাম বেশি হওয়ায় বিক্রি হচ্ছে কম। বেশি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, খাদ্যের দাম বাড়ায় গরুর দামও বেড়েছে।
ধোলাইখাল ও ধূপখোলা : পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ধোলাইখাল ট্রাক ট্রার্মিনাল ও ধূপখোলা পশুর হাটে শনিবার সকালে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে কিছুক্ষণ পর পর ট্রাকভর্তি করে গরু আসছে। এ হাটের রায়সাহেব বাজার মোড়ে সকাল ১০ থেকে সাড়ে ১১টা-এই দেড় ঘণ্টায় ৩টি ট্রাক থেকে ৫২টির মতো গরু নামানো হয়। রায়সাহেব বাজার থেকে দয়াগঞ্জ মোড় হয়ে লোহারপুল এলাকা পর্যন্ত গরুর হাট ছড়িয়ে গেছে। এ ছাড়া রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে লাগানো হচ্ছে বাঁশের খুঁটি। সঙ্গে লম্বা করে বাঁশ বাঁধা হচ্ছে। আর উঁচু-নিচু মাটি সমান করে কোনো কোনো স্থানে দেওয়া হচ্ছে বালু বা ইট।
এ বছর মূল হাটের বাইরেও তৈরি করা হয়েছে বিশাল আকারের ছাউনি। রাস্তার দুই পাশে হাট বসার ফলে বিপাকে পড়েছেন ব্যাংক-বীমা ও বিভিন্ন দোকান মালিকরা। নির্ধারিত সময়ের আগেই রাস্তা বন্ধ করে হাট বসায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। এমনকি এসব এলাকায় তীব্র যানজট দেখা গেছে। ফলে তীব্র ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষসহ ও আশপাশের বাসিন্দাদের। এ ছাড়া নিরাপত্তার জন্য এরই মধ্যে পুলিশ, র্যাব ও ট্রাফিক পুলিশের কন্ট্রোল রুম বসানো হয়েছে। হাট কর্তৃপক্ষ বলছে, এখনও জমেনি পশুর হাট। কেউ কেউ আগেই গরু নিয়ে এসেছেন হাটে। তবে এ সময়ে গরু তেমন বিক্রি হয় না। বিক্রি জমজমাট হবে শেষ তিন দিন।
সড়কের মধ্যে বসে পশুর হাট বসা নিয়ে গোয়ালঘাটের মুদি ব্যবসায়ী আতাহার হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার দোকানের সামনে তাবু টাঙিয়ে গরু বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়েছে। দোকান খোলারও জায়গা নেই। একজন কাস্টমার যে আসবে সেই ব্যবস্থাও নেই। রাস্তা দিয়ে হাঁটার অবস্থাও নেই। কেউ কোনো নিয়মনীতি মানছে না। মনে হয় দেশটা মগের মুল্লুক। দেখা ছাড়া কাউকে বলাও যায় না।
চুয়াডাঙ্গা থেকে থেকে আসা ফোর পয়েন্ট অ্যাগ্রো খামারির মালকি মনজুর হোসেন বলেন, গত বৃহস্পতবিার রাতে ১৪টি গরু নিয়ে এসেছি।
আরেক ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন বলেন, মেহেরপুর থেকে ৩০টি গরু নিয়ে এসেছি। আমাদের সব দেশীয় গরু। একটা গরু ৭০ হাজার টাকা দিয়ে কিনলে সেই গরুর পেছনে খরচ হয়েছে দেড় লাখ টাকা। এসব হিসাব সামনে রেখেই আমরা আমরা গরুর দাম চাচ্ছি আড়াই লাখ টাকা।
রাজধানীর খিলগাঁও রেলগেট বাজারের মৈত্রী ক্লাবসংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গায় দুপুর ১২টার দিকে গিয়ে দেখা গেছে, এ হাটে ক্রেতার উপস্থিতিও ছিল হাতে গোনা। কাদা আর গোবরে একাকার হয়ে যাওয়া মাঠে ঢুকতেই বেকায়দায় পড়ছেন বেপারিরা। তবে কাদা-পানি থেকে গরুকে বাঁচাতে পাশ থেকে মাটি নিয়ে গরুর দাঁড়ানোর জায়গা উঁচু করা হয়েছে, নানা ধরনের ত্রিপল দিয়ে তার ওপরে দেওয়া হয়েছে ছাউনি।
মাগুরা সদর থেকে ৬০টি গরু নিয়ে আসা রিপন মাহমুদ সময়ের আলোকে বলেন, আমরা আট জন মিলে গত শুক্রবার রাতে ঢাকায় এসেছি। এখনও একটি গরুও বিক্রি হয়নি। এখন তো সবাই দাম শুইনা চলে যাইতাছে।
যশোরের হরিণাকু- থেকে আসা বেপারি ইসরাফিল হোসেন বলেন, শুক্রবার রাতে এসেছি। আজ সকালে বালু দিয়ে মাটি করেছি। পরে পলিথিন কিনে তাঁবু টাঙিয়ে গরু রাখার ব্যবস্থা করেছি। আশা করছি ভালো ব্যবসা হবে। এ হাটে কেজি ধরে পশু বিক্রি করতে দেখা গেছে, ফকির ব্রাদার্স অ্যাগ্রোকে। এ ফার্মের মালিক তসলিম হোসেন এসেছেন ময়মনসিংহের নান্দাইল থেকে।
তিনি বলেন, আমি অনলাইনে একশ গরু বিক্রি করেছি। আর এ হাটে নিয়ে এসেছি ৩৪টি গরু। আরও আসবে।
কমলাপুরে অস্থায়ী পশুর হাট : কমলাপুর স্টেডিয়াম সংলগ্ন বিশ^রোডের আশপাশের খালি জায়গায় বসেছে এ অস্থায়ী পশুর হাট। যা বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশ থেকে শুরু করে হয়ে গোপীবাগের কিছু এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে গেছে। হাট পুরোপুরি প্রস্তুত না হলেও এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিক্রির জন্য কুরবানির পশু নিয়ে এসেছেন ব্যবসায়ীরা। পুলিশ, র্যাব ও ট্রাফিক পুলিশের কন্ট্রোল রুম বসানো হয়েছে। হাটে পর্যাপ্ত গরু থাকলেও ক্রেতার সংখ্যা খুবই কম।
সিরাজগঞ্জ থেকে দুটি গরু নিয়ে বিক্রি করতে হাটে এসেছেন জুম্মন শেখ মিয়া। একটির নাম লাল বাদশা ওজন ১৮ মণ। এর দাম চাওয়া হচ্ছে ১৫ লাখ টাকা। আরেকটির নাম কালা পানি। ওজন ২৩ মণ। দাম চাচ্ছেন ২০ লাখ টাকা।
বগুড়ার শেরপুর থেকে আসা বেপারি মো. আশরাফ মিয়া বলেন, এখনও বিক্রি শুরু হয়নি তাই পরিস্থিতি এখনও বোঝা যাচ্ছে না। কমলাপুর পশুর হাটের সমন্বয়ক বিএম সিরাজুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, আমাদের হাট একটু দেরিতে শুরু হয়েছে। বেপারিরাও তাদের পশু নিয়ে আসতে শুরু করেছেন। তবে এখনও হাট জমে উঠেনি।
গাবতলী এবং বছিলা : শুক্রবার থেকেই এসব হাটে গরু আসা শুরু হলেও এখনও পুরোপুরি জমে উঠেনি। শনিবার বিকালে সরেজমিন দেখা যায়, গাবতলী পশুর হাটে বিক্রেতারা অলস সময় পার করছেন। হাট পুরোপুরি জমে না উঠলেও ক্রেতারা কুরবানির পশু দেখতে হাটে আসছেন। টাঙ্গাইল থেকে ৮৫টি গরু নিয়ে গাবতলী হাটে এসেছেন নাহিদ ইসলাম (৩৫)।
তিনি সময়ের আলোকে বলেন, হাটে ক্রেতাদের তেমন উপস্থিতি নেই। মাত্র তিনটি গরু বিক্রি করতে পেরেছি। তবে এখনও চার দিন বাকি আছে। আশা করি সব বিক্রি হয়ে যাবে।
কুষ্টিয়া থেকে ৫৫টি গরু নিয়ে গাবতলী হাটে এসেছেন ভোলা মিয়া। তিনি বলেন, চার দিন আগে থেকেই গাবতলী হাটে গরু নিয়ে এসেছি, এবার হাটের পরিস্থিতি তেমন ভালো না, এখনও একটি গরুও বিক্রি করতে পারিনি। তবে আশা করি, সোম ও মঙ্গলবার বিক্রি বাড়বে। নওগাঁ থকে আসা শরিফুল ইসলাম (৪৫) বলেন, কেবল হাট শুরু হয়েছে এখন ছোট ও মাঝারি সাইজের গরুগুলোই বেশি বিক্রি হচ্ছে। বড় গরুর তেমন বিক্রি নেই। আমার ৭৫টি গরুর মধ্যে ১টি গরু বিক্রি করতে পেরেছি।
কুষ্টিয়া থেকে ৩৫টি গরু নিয়ে এসেছেন আজিজুল হক বেপারি। তার প্রতি গরু তিনি চাচ্ছেন ১ লাখ ৩০ থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। কিন্তু এই দামে কোনো ক্রেতা কিনতে রাজি হচ্ছেন না।
চুয়াডাঙ্গা থেকে গত শুক্রবার ২২টি গরু নিয়ে এসেছেন মো. আলাউদ্দিন ও তরিকুল বেপারি। ৯টি বাদে বাকি সব গুরু বিক্রি হয়ে গেছে। ঈদের আগেই সব গরু বিক্রি হয়ে যাবে বলে মনে করছেন তারা।
মো. তরিকুল সময়ের আলোকে বলেন, এবার গরু কম আসছে। যে কারণে দাম বেশ ভালো পাচ্ছি। ৯টি বাদে সব গরু বিক্রি হয়ে গেছে। চার থেকে ৫ হাজার টাকা লাভ হলেই ছেড়ে দিচ্ছি। তবে একটা গরুতে বেশি লাভ হয়েছিল। ২০ হাজার টাকায় কিনে ৫২ হাজার টাকায় বিক্রি করতে পেরেছি। এটিই এখন পর্যন্ত বেশি লাভে বিক্রি হয়েছে।
গরুর মালিক মো. পলাশ বলেন, আমি গোপালগঞ্জ থেকে এই হাটে চারটি গরু নিয়ে এসেছি। এর মধ্যে ‘কাল্লু ভাই’ সবচেয়ে বড়, এরপর রয়েছে ‘বুলেট’ দাম ৮ লাখ, ‘টাইগারের’ দাম ৭ লাখ ও ‘ধলু মোল্লা’র দাম ৫ লাখ টাকা চাওয়া হচ্ছে। কাল্লু ভাইয়ের দাম গোপালগঞ্জে সাড়ে ৭ লাখ টাকা বলেছিল। এই হাটে আজকেই এসেছি এখন পর্যন্ত কেউ দাম বলেনি। সবাই দেখছে আর দাম শুনছে। আশা করি কাল-পরশু ভালো দামের কাস্টমার পাব।
অন্যদিকে হাউজিংয়ের মধ্যে হাট হওয়ায় এলাকার মানুষের মধ্যে একটা উৎসবের আমেজ দেখা গেছে। বিভিন্ন বয়সের নারী ও পুরুষ এবং শিশুরা এসেছে হাটে গরু দেখার জন্য। পছন্দ হলে কেউ আবার দামাদামি করে কিনেও নিচ্ছেন।
Leave a Reply