
অনলাইন ডেস্ক: দেশ থেকে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস বন্ধে আলেম-ওলামাদের সরকারকে সহযোগিতা করতে আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, আমরা কুসংস্কার, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস নির্মূলে আপনাদের সহযোগিতা চাই। সবাইকে বিশেষ মনোযোগ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি, যাতে আমাদের সন্তানরা বিপথে যেতে না পারে। আপনারা সবার মাঝে ইসলামের প্রকৃত মর্মবাণী ছড়িয়ে দেবেন। যাতে কেউ কাউকে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের পথে বিচ্যুত করতে না পারে। ইসলামের বদনাম করতে না পারে। কেননা ইসলাম পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম এবং সর্বদা শান্তির কথা বলে। যারা জঙ্গিবাদি তারা সন্ত্রাসী। তারা কোনো ধর্ম, দেশ বা জাতি গোষ্ঠীর নয়। তাই সবার কাছে অনুরোধ থাকবে, ধর্মের মানইজ্জত রক্ষা করবেন। কেউ যেন এই বিপথে না যায়। সন্তানের নিয়মিত স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিতির বিষয়টা এবং কার সঙ্গে মিশছে সে বিষয়টা লক্ষ রাখতে হবে।
রোববার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ দ্বীনি সেবা ফাউন্ডেশন আয়োজিত জাতীয় হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতা-২০২৩-এর জাতীয় পর্যায়ের বিজয়ী হাফেজগণের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
এ সময় বিজয়ী ৫ জন হাফেজের হাতে প্রধানমন্ত্রী পুরস্কার হিসেবে ক্রেস্ট, নগদ অর্থের চেক এবং সনদ তুলে দেন। তারা হলেন-প্রথম হাফেজ আফফান বিন সিরাজ, দ্বিতীয় হাফেজ মো. ওসমান গণি, তৃতীয় হাফেজ মো. আবু জাফর শাকিল (দৃষ্টি প্রতিবন্ধী), চতুর্থ হাফেজ মো. খালিদ সাইফুল্লাহ এবং পঞ্চম হাফেজ মো. মোতাসিম বিল্লাহ। এ অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মো. ফরিদুল হক খান, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মু. আ. হামিদ জমাদ্দার, বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের মহাপরিচালক মাওলানা মুফতি উবায়দুর রহমান খান নদভী, আলহাজ সুফী মো. মিজানুর রহমান এবং হজরত মাওলানা সালাউদ্দিন নানোপুরী বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব ও বাংলাদেশের দ্বীনি সেবা ফাউন্ডেশনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক আবুল কালাম আজাদ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নানা ধর্মের লোক এই বাংলাদেশে আছে এবং যার যার ধর্ম সে সে পালন করবে এটা আমাদের নবী করীমের (সা.) শিক্ষা, আমরা সেভাবেই চলব। চূড়ান্ত বিচার বা শেষ বিচার করবেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। কাজেই কে কোন ধর্মের, কে হিন্দু না মুসলমান না বৌদ্ধ না খ্রিস্টান না কাদিয়ানী তা দেখার দায়িত্ব আমাদের না। যার যার কর্মফল সে সে ভোগ করবে। বিচারের ভার নিজেদের হাতে তুলে না নিয়ে বরং আরও বেশিসংখ্যক মানুষ যেন ইসলামের ছায়াতলে আসে সে জন্য সবার প্রচেষ্টা থাকা উচিত। আলেম ও ওলামায়ে কেরাম যারা আছেন, আমার অনুরোধ ইসলাম ধর্মের মর্ম বাণী প্রচার করে আরও অধিকসংখ্যক মানুষ যেন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে পারে, সেদিকে সবার দৃষ্টি দিতে হবে। সন্ত্রাস করে ইসলাম সম্পর্কে বদনাম যেন কেউ না করতে পারে। কোমলমতি ছেলেদের মাথাগুলো খারাপ করে দিয়ে তাদের বিপথে চালানো, তাদের জীবনটাকে ধ্বংস করা, সুইসাইড অ্যাটাক করে মানুষ মারা-এটা তো ইসলাম ধর্মে মহাপাপ, গোনাহের কাজ। সুইসাইড করলে তো কেউ বেহেশতে যাবে না এটাই তো বলা আছে।
‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে বলেই এ দেশের মানুষ দুই বেলা পেটভরে ভাত খেতে পারছে’ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, সবাইকে আমরা ঘর তৈরি করে দিচ্ছি। কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে বিনা পয়সায় ৩০ প্রকার ওষুধ দিচ্ছি। মানুষকে শিক্ষা এবং কম্পিউটার শিক্ষার ব্যবস্থা করে দেওয়ায় তারা দেশ-বিদেশে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে। কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি যাতে ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে পার্থিব শিক্ষা নিয়ে সবাই নিজেরা নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারে। আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ হতে পারে, সে ব্যবস্থাটাই করে দিচ্ছি।
উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা প্রাপ্তির প্রসঙ্গে উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, আজকে ডিজিটাল বাংলাদেশ করেছি। দারিদ্র্যের হার ৪০ থেকে ১৮ ভাগে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। হতদরিদ্র ২৫ থেকে ৫ ভাগে নামিয়ে এনেছি। আগামীতে বাংলাদেশে আর একজন মানুষও হতদরিদ্র থাকবে না। প্রতিটি মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। জাতির পিতা আমাদের এ দেশ স্বাধীন করে দিয়েছেন এবং আমরা বিশে^ একটা মর্যাদা পেয়েছি। সে মর্যাদা নিয়েই মাথা উঁচু করে চলতে চাই। পদ্মা সেতু নির্মাণের সময় সরকার, দল এবং আমার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ভুয়া দুর্নীতির অভিযোগ এনে বদনাম দেওয়ার প্রচেষ্টাকে মিথ্যা বলে প্রমাণ করতে পেরেছি। আমাদের বদনাম দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু আমরা সেটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে বলেছিলাম এখানে কোনো দুর্নীতি হয়নি। তারাও কোনো দুর্নীতির প্রমাণ করতে পারেনি। বরং নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণ করে প্রমাণ করেছি-আমরা কারও মুখাপেক্ষী নই।
জাতীয়ভাবে হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করার জন্য উদ্যোক্তা-বাংলাদেশ দ্বীনি সেবা ফাউন্ডেশনকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতায় আমাদের ছেলে-মেয়েরা প্রতি বছরই বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে অনেক ভালো ফল অর্জন করছে। তারা একাধিক গ্রুপে চ্যাম্পিয়নও হয়েছে। এটি বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় মর্যাদা ও গৌরবের বিষয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন খাঁটি মুসলমান। তিনি যেমন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের স্থপতি তেমনি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামের প্রচার-প্রসারের স্থপতিও তিনি। বঙ্গবন্ধু ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও মাদরাসা বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেন। জাতির পিতা তাবলিগ জামাতের জন্য কাকরাইল মসজিদে জমি দান করেন। টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে বিশ্ব ইজতেমার জন্য জায়গা বরাদ্দ দেন। জামিয়া মাদানিয়া দারুল উলুম যাত্রাবাড়ী কওমি মাদরাসার জন্যও জমি প্রদান করেন বঙ্গবন্ধু। তিনি বেতার ও টেলিভিশনের অনুষ্ঠান শুরু ও সমাপ্তিতে কুরআন তেলাওয়াতের প্রচলন করেন এবং আইন করে মদ নিষিদ্ধ করেন এবং ঘোড়দৌড় এবং জুয়া বন্ধ করেন। আওয়ামী লীগ সবসময়ই ইসলামের খেদমত এবং উন্নয়নে কাজ করেছে।
২০০৯ সালে সরকারে আসার পর আমরা বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণ করি। মাদরাসা শিক্ষার্থীদের জন্য সরকার ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে। আরবি, বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় পবিত্র কুরআনের ডিজিটাল ভার্সন তৈরি করেছে। কওমি মাদরাসার ডিগ্রির সরকারি স্বীকৃতি প্রদান করেছে, দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সম্মান প্রদান করেছে। জাকাত তহবিল ব্যবস্থাপনা আইন ২০২৩ এবং ইমাম ও মুয়াজ্জিন কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করে দুস্থ এবং আর্থিক দুর্দশাগ্রস্ত ইমাম-মুয়াজ্জিনদের আর্থিক সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ট্রাস্টের সদস্যভুক্ত ইমামদের সুদমুক্ত ঋণ প্রদান করারও ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ট্রাস্টের সাহায্যার্থে তিনি সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
আওয়ামী লীগ সরকারের ই-হজ ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জেদ্দা হজ টার্মিনালে প্লাজা ভাড়া নেওয়ায় হাজিদের দুর্ভোগ বহুলাংশে লাঘব হয়েছে। আশকোনা হজক্যাম্প আধুনিকায়ন করে হজযাত্রীদের জন্য কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন অফিসও আধুনিকায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি মক্কা ও মদিনায় হজ অফিস খোলা হয়েছে এবং মক্কায় স্থায়ী হজ অফিস নির্মাণে সৌদি সরকারের কাছে জায়গা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
Leave a Reply