1. id69_178fc3@local.host : id69_178fc3 :
  2. shahjahanbiswas74@gmail.com : Shahjahan Biswas : Shahjahan Biswas
  3. ssexpressit@gmail.com : sonarbanglanews :
  4. wp2_de0746@wp2shell.invalid : wp2_de0746 :
শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:১৪ পূর্বাহ্ন

আজ ঐতিহাসিক ৭ মার্চ: বাঙালির মুক্তির বার্তা দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু

  • সর্বশেষ আপডেট : মঙ্গলবার, ৭ মার্চ, ২০২৩
  • ২৪৯ বার পড়েছেন

অনলাইন ডেস্ক: ঐতিহাসিক ৭ মার্চ আজ। বাঙালি জাতির ইতিহাসে অবিস্মরণীয় দিন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক উত্তাল জনসমুদ্রে দেশের স্বাধীনতার প্রস্তুতির ডাক দেন। বেলা ১১টা থেকে রেসকোর্স ময়দানে ছিল শুধু মানুষ আর মানুষ। লাঠি হাতে প্রতিবাদী মানুষ। শহরের মানুষ, গ্রামের মানুষ। শিক্ষিত, অশিক্ষিত, ধনী-গরিব ও বৃদ্ধা-যুবা। মোটকথা সব স্তরের মানুষ। ফলে ঘটনা প্রবাহে সেদিনের জনসভা পরিণত হয় জনসমুদ্রে। উদ্দেশ্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনবেন সবাই।

বেলা ৩টা ২০ মিনিটে মঞ্চে ওঠেন স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু। গণমানুষের স্লোগানে আকাশ কাঁপিয়ে ওঠে- ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’, ‘তোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ’। তিনি তার বজ্রকণ্ঠে বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বঙ্গবন্ধু জনগণকে মুক্তিসংগ্রামের প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল’। সেই ভাষণ বাঙালির মুক্তি ও জাতীয়তাবোধ জাগরণের এক মহাকাব্য। সেই ভাষণ এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণিক দলিল। ৭ মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মুক্তির বার্তা দিয়েছিলেন। ফলে তার ৭ মার্চের ভাষণ দেশের মানুষকে স্বাধীনতার প্রস্তুতি নিতে উজ্জীবিত করে। দীর্ঘদিনের পরাধীনতার গ্লানি, শোষণ, নির্যাতনের বিরুদ্ধে জ্বলে ওঠার মন্ত্র হিসেবে কাজ করে। ভাষণে উদ্দীপ্ত হয়ে আপামর জনগণ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করে।

দেশের স্বনামধন্য কবি নির্মলেন্দু গুণ রক্তঝরা একাত্তরের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বহুল প্রতীক্ষিত শিহরণ-জাগানো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ডাকসংবলিত ঐতিহাসিক বজ্রকঠিন ভাষণের মুহূর্তটি এভাবেই কবিতায় তুলে ধরেছিলেন। ‘একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য কি দারুণ অপেক্ষা আর উত্তেজনা নিয়ে/ লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে/ ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে/ ‘কখন আসবে কবি’?/

শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে/ রবীন্দ্রনাথের মত দৃপ্ত পায়ে হেঁটে/ অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন/

কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?/ গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতাখানি/ এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম/ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।/ সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।’

একাত্তরের ৭ মার্চ মুক্তিকামী বাঙালি জাতিকে মুক্তির বাণী শুনিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালির পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার চূড়ান্ত প্রেরণা। দীর্ঘ ২৪ বছরের লড়াই-সংগ্রামের পর বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণেরই পরিণতি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।

স্বাধীনতার ৫২ বছরেও মাত্র ১৮ মিনিটের সেই ভাষণের আবেদন এখনও বিশ্বব্যাপী। প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে এ ভাষণ প্রেরণার উৎস। ১৯৭৫ পরবর্তী দীর্ঘ ২১ বছর বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণটি বাজানোর ওপর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা ছিল। সময়ের ব্যবধানে স্বাধীনতার ডাকসংবলিত বঙ্গবন্ধুর বজ্রকঠিন সেই ভাষণকে বিশ^ প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের শিক্ষা বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ইউনেস্কো এ ভাষণকে তাদের ‘মোমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল’ রেজিস্টারে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। ইউনেস্কোর স্বীকৃতির পর বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের অমূল্য দলিল। এ ভাষণ বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়ায় বাংলাদেশের মানুষের গৌরব-সম্মান আরেকবার আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই বাঙালি জাতি আজ কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালির স্বাধীনত-মুক্তি ও জাতীয়তাবোধ জাগরণের মহাকাব্য, বাঙালি তথা বিশের সব লাঞ্ছিত-বঞ্চিত নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের মুক্তির সনদ। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বে সর্বাধিকবার প্রচারিত ও শোনা ভাষণ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের জন্য ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন নিউজউইক সাময়িকী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘রাজনীতির কবি’ হিসেবে অভিহিত করে। একাত্তরের উত্তাল ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বাঙালির জাতির পিতা যে ভাষণ দেন, কিউবার ফিদেল ক্যাস্ট্রো সেটিকে আখ্যায়িত করেন ‘একটি অনন্য রণকৌশলের দলিল’ হিসেবে।

১৯৭১ সালে পরাধীনতার দীর্ঘ প্রহর শেষে পুরো জাতি তখন স্বাধীনতার জন্য অধীর অপেক্ষায়। শুধু প্রয়োজন একটি ঘোষণার, একটি আহ্বানের। অবশেষে ৭ মার্চ এলো সেই ঘোষণা। অগ্নিঝরা একাত্তরের এইদিনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা নামক মহতি কাব্যের স্রষ্টা কবি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রগম্ভীর কণ্ঠ থেকে ধ্বনিত হয়েছিল স্বাধীনতার ঘোষণা। বঙ্গবন্ধু শুধু স্বাধীনতার চূড়ান্ত আহ্বানটি দিয়েই ক্ষান্ত হননি, স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের রূপরেখাও দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর এ ঘোষণা মুক্তিকামী মানুষের কাছে লাল-সবুজ পতাকাকে মূর্তিমান করে তোলে। আর এই মাধ্যমে বাঙালির ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা হয়। শুধু স্বাধীনতা যুদ্ধে নয়, বঙ্গবন্ধুর সেই বজ্রনির্ঘোষ আজও বাঙালি জাতিকে উদ্দীপ্ত করে, অনুপ্রাণিত করে। মূলত রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণই ছিল ৯ মাসব্যাপী বাংলার মুক্তি সংগ্রামের মূল ভিত্তি। বাঙালির নিজের দেশের হাজার বছরের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়ার অবশ্যম্ভাবী পরিণতির দিকে এগোতে থাকে। তাই ৭ মার্চ বাঙালি জাতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা একটি অনন্য দিন। সময়ের বিবর্তনে অনেক কিছুই কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। বিকৃতির নিকৃষ্ট ষড়যন্ত্রের আবহে বদলে ফেলার চেষ্টা হয়েছে স্বাধীনতার অনেক ইতিহাস। কিন্তু এ ৫২ বছরে অনেক কিছুই বদলে গেলেও বদলানো যায়নি, শুধু ১৮ মিনিটের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণটি। বিশে^র মধ্যে মাত্র একটি ভাষণ যা যুগের পর যুগ, বছরের পর বছর, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বেজে চলেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ঐতিহাসিক ভাষণটি যখন শোনে, তখনই তাদের মানসপটে ভেসে ওঠে স্বাধীনতার গৌরবগাথা আন্দোলন-সংগ্রামের মুহূর্তগুলো, আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে ওঠে দেশপ্রেমের আদর্শে।

দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তার দেওয়া বাণীতে বলেন, ১৯৭১ সালের এ দিনে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বজ্রকণ্ঠে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। পুরো বাঙালি জাতি সেদিন মন্ত্রমুগ্ধের মতো অবগাহন করেছিল রাজনীতির মহাকবি বঙ্গবন্ধুর অমর কবিতা। মাত্র ১৮ মিনিটের এ মহাকাব্যে ধ্বনিত হয়েছিল বাঙালি জাতির মুক্তির মহামন্ত্র। বঙ্গবন্ধুর শাণিত ও প্রদীপ্ত উচ্চারণে কেঁপে উঠেছিল পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের মসনদ। মূলত ৭ মার্চের ভাষণেই নিপীড়িত-নির্যাতিত বাঙালি জাতি খুঁজে পেয়েছিল শোষণমুক্তির কাক্সিক্ষত পথ।

বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আজ বাঙালি জাতির জীবনে এক অবিস্মরণীয় দিন। বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের এই দিনে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে শহিদ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) দাঁড়িয়ে বজ্রকণ্ঠে রচনা করেছিলেন ১৮ মিনিটের এক মহাকাব্য। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং বাংলাদেশ একই সূত্রে গাঁথা। একমাত্র বঙ্গবন্ধুই ছিলেন হাজার বছরের শোষিত-বঞ্চিত বাঙালিদের মধ্যে সবচেয়ে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর।

আওয়ামী লীগের কর্মসূচি: ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে-৭ মার্চ ভোড় সাড়ে ৬টায় বঙ্গবন্ধু ভবন ও দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় এবং দলীয় পতাকা উত্তোলন। সকাল ৮টায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ। বেলা ৩টায় ফার্মগেটের খামারবাড়ী কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে আওয়ামী লীগের আলোচনা সভা। এতে সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন।

এদিকে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সোমবার এক বিবৃতিতে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে দলের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসূচি গ্রহণ করে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করার জন্য দল ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর সব স্তরের নেতাকর্মী, সমর্থক এবং সর্বস্তরের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ময়দানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের নানা দিক নিয়ে সময়ের আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন মহান মুক্তিযুদ্ধের ২ ও ৩ নম্বর সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা আর কে চৌধুরী। ওই দিন মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন তিনি। আর কে চৌধুরী বলেন, ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালির জাতীয়তাবোধ জাগরণের মহাকাব্য, বাঙালি তথা বিশ্বের সব লাঞ্ছিত-বঞ্চিত, নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের মুক্তির সনদ। ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালির পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রেরণা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মূলত ৭ মার্চ স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, ওই সময়ে আমি ছিলাম ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ। গাজী গোলাম মোস্তফা সভাপতি, মোহাম্মদ সুলতান সেক্রেটারি আর সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন মনসুর ভাই। সাধারণত ঢাকার কর্মসূচিগুলো পালনের দায়িত্ব থাকত আমাদের ওপর। ৭ মার্চের আগের দিন ৬ মার্চ আমরা যারা মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ছিলাম, তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু।

সেই ধারাবাহিকতায় ৭ মার্চ সকালে আমরা বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি, বাড়ির চারপাশে লোকারণ্য। তিনি সবকিছুই আলাপ-আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতেন। অনেকেই অনেক কিছু বলেছিলেন। কিন্তু ৭ মার্চ বেলা ৩টায় তিনি বাসা থেকে বের হন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উদ্দেশে। এর আগে তিনি বাসায় পায়চারি করছিলেন, তখন তাঁর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বললেন, ‘তোমার এত চিন্তা কিসের। তোমার হাতে এত কাগজ কিসের। এসব কাগজপত্র তুমি রাখ। তোমার মনে যা চায়, তোমার যা কিছু বলতে ইচ্ছে করে, সেটি তুমি বলবে ভাষণে।’ আমরা নগর আওয়ামী লীগের নেতারাই বঙ্গবন্ধুকে রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় নিয়ে আসি। ৭ মার্চ বেলা ৩টায় আমরা বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ৩২ নম্বর থেকে গাড়িতে রওনা দিই। বঙ্গবন্ধুর গাড়ির পেছনে ছিল আমাদের গাড়ি। আমরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এসে পৌঁছলাম। শেখ কামালসহ অনেকেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মঞ্চে উঠলেন। আমি যেহেতু মহানগর নেতা ছিলাম, সেই হিসেবে আমিও মঞ্চের পেছনে বসা ছিলাম। বঙ্গবন্ধু যখন ভাষণ দেন তখন আমরা মঞ্চের কোণে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সেই ঐতিহাসিক দিনে উপস্থিত থাকতে পেরে নিজেকে সর্বদা ধন্য মনে করি। ওই দিন বিকালটা ছিল অন্যরকম। এই দিনটির জন্য অপেক্ষায় ছিল সমগ্র জাতি। এক পাতাঝরা বসন্তের বিকাল এভাবে বদলে দিতে পারে ইতিহাসের মোড়, বিশে^র ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল। সেদিন বেলা ৩টা ২০ মিনিটে দেওয়া মাত্র ১৮ মিনিটের ভাষণ একটি জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে যেভাবে উজ্জীবিত করেছিল, তার তুলনা আর কোনো কিছুর সঙ্গে হতে পারে না।

আর কে চৌধুরী বলেন, বঙ্গবন্ধু যখন রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত হন, তখন লাখো মানুষের উপস্থিতিতে কানায় কানায় পূর্ণ ময়দান। পদ্মা-মেঘনা-যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা-এ ধরনের মুহুর্মুহু স্লোগানে প্রকম্পিত চারদিক। সেদিন বঙ্গবন্ধু আমাদের যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশও দিয়েছিলেন। ৭ মার্চের ভাষণের ভেতর দিয়ে ফুটে ওঠে এক দৃঢ়চেতা রাজনৈতিক নেতার পরিচয়। সেই অধিকার তিনি এনে দিয়েছিলেন মুক্তিকামী বাঙালিকে।

বঙ্গবন্ধুর ওপর আল্লাহর রহমত ছিল উল্লেখ করে আর কে চৌধুরী বলেন, ৭ মার্চ তিনি মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেদিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলামসহ বিশ্বের বড় বড় কবির মতো করে কবিতার ভাষায় বঙ্গবন্ধু সেদিন ভাষণ দিয়েছিলেন। সেদিন নির্দেশ ও আদেশগুলো একে একে বলে গেছেন। পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি সেদিন যা বলেছিলেন, সেটি কিন্তু কোনো আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে বলেননি। আমাদের সঙ্গেও অনেক আলাপ-আলোচনা হয়েছিল। সেদিন কিন্তু তার একটি কথাও তিনি বলেননি। তিনি তার মতো কবিতা পড়ে গেছেন। সেদিন তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে কবিতা পড়েছিলেন। সেই কবিতা আজকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। তিনি ছিলেন মহান নেতা। বঙ্গবন্ধু ছিলেন সিংহ হৃদয়ের অধিকারী। বঙ্গবন্ধু বিপ্লবী নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন গণতান্ত্রিক নেতা। সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতেন। কিন্তু ৭ মার্চ আলাপ-আলোচনা ছাড়াই ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই ভাষণ আজও একই রকম রয়েছে। যেটি বাংলা, বাঙালি যতদিন থাকবে, ততদিন এই ভাষণ মানুষের হৃদয়ে থাকবে। বঙ্গবন্ধুর মতো বড় হৃদয়ের মানুষ আর পাই না। জাতির পিতার কথা মনে পড়লেই আর স্থির থাকতে পারি না।

তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে, এখানে মওলানা ভাসানীর অবদান ছিল অনেক বেশি। আমরা একবার ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু পুলিশ আমাদের বাধা দিল। তখন ভাসানী সাহেব বলেছিলেন, তোরা সরে যা। আমাদের কর্মসূচিতে বাধা দিস না। তখন ছিল আজানের ওয়াক্ত। তিনি আজানের জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন রাস্তার ওপর। তিনি সুরা পড়া শুরু করলেন। কিন্তু সুরা আর শেষ হয় না। ইতিমধ্যে শুরু হলো প্রচণ্ড বৃষ্টি। আমরা সেই সময় কর্মসূচি পালন করলাম। এ ছিলেন মওলানা ভাসানী। তার বাংলাদেশের জন্য যে অবদান সেটি অনস্বীকার্য।

খবরটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর পড়ুন :