
অনলাইন ডেস্ক: আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশ দেশে বিরাজ করছে কিনা সেই পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে গত ৯ জুন থেকে বাংলাদেশ সফর করছেন ইউরোপিয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রাথমিক পর্যবেক্ষক দল (ইলেকশন এক্সপ্লোরেটরি মিশন বা অনুসন্ধানী অগ্রগামী দল)। যার ধারাবাহিকতায় সফরের ৯ম দিনে গণমাধ্যমের সম্পাদক, জেষ্ঠ্য সাংবাদিক এবং গণমাধ্যম সংক্রান্ত এনজিও প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন ইইউর দল। এসব বৈঠকে ভোটের মাঠে গণমাধ্যম কতটা স্বাধীন সেই বিষয়ে জানতে চায় ইইউর প্রাক নির্বাচনী দল। এমন সময় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে ইইউর কাছে উদ্বেগহ প্রকাশ করেন সম্পাদকরা।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সফররত ইইউর প্রাক নির্বাচনী দল সোমবার ৩ ভাগে গণমাধ্যমের কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রথম পর্যায়ের বৈঠকে ডেইলি অবজারভার সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরী, নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবির, দি বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড সম্পাদক ইনাম আহমেদ এবং প্রথম আলোর ইংরেজি সংস্করণের সম্পাদক আয়েশা সিদ্দিক উপস্থিত ছিলেন। এরপর কূটনৈতিক প্রতিবেদকদের সংগঠন ডিক্যাবের পাঁচ সদস্য দৈনিক যুগান্তরের প্রধান প্রতিবেদক মাসুদ করিম, বার্তা সংস্থা ইউএনবির বিশেষ প্রতিনিধি এ কে এম মইনুদ্দিন, যমুনা টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি মাহফুজ মিশু, চ্যানেল আইয়ের বিশেষ প্রতিনিধি পান্থ রহমান এবং চ্যানেল টুয়েন্টি ফোরের জেষ্ঠ্য প্রতিবেদক মোরশেদ হাসিবের সঙ্গে বৈঠক করেন ইইউ। এছাড়া সোমবার বিকেলে আর্টিকেল ১৯সহ গণমাধ্যম সংক্রান্ত এনজিও প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন ইইউর দল।
বৈঠক শেষে প্রথম আলোর ইংরেজি সংস্করণের সম্পাদক আয়েশা সিদ্দিক এই প্রতিবেদককে বলেন, এটা খুবই সাধারণ একটা বৈঠক ছিল। তেমতন কিছু না, শুধুমাত্র মিডিয়ার স্বাধীনতা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। আর নির্বাচনের আগে মিডিয়ার ভূমিকা কী, এগুলো জানতে চাওয়া হয়। জটিল কিছু না।
মিডয়ার ভূমিকার বাইরে নির্বাচনের পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছে কিনা, জানতে চাইলে প্রথম আলোর ইংরেজি সংস্করণের সম্পাদক আয়েশা সিদ্দিক বলেন, আমাদের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়নি। আমাদের কাছে নির্বাচনের পরিবেশ এগুলো নিয়ে তেমন কিছু জানতে চায়নি। আমাদের কাছে মিডিয়া সম্পর্কেই জানতে চেয়েছে। আমি বলেছি যে ভোটের সময় যাতে মিডিয়া স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে এখন থেকেই।
বৈঠক শেষে ডেইলি অবজারভার সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে বিভেদ থাকলেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সবারই উদ্বেগ আছে, বৈঠকে এই বিষয়টি জানিয়েছি। আরো বলেছি যে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য গণমাধ্যম ভূমিকা রাখবে, এই বিষয়ে ইইউকে আশ্বস্ত করা হয়েছে।
বৈঠক শেষে নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবির সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের নির্বাচন অনুষ্ঠান সুষ্ঠু করতে ইইউ প্রতিনিধিদের আসতে হচ্ছে, বিষয়টি দুঃখজনক। তাদের কাছে অনুরোধ করেছি যে তারা ফিরে গিয়ে এমন প্রতিবেদন যেন না দেয়, যা বাংলাদেশের জনগণ প্রত্যাশা করে না।
বৈঠক শেষে দৈনিক যুগান্তরের প্রধান প্রতিবেদক মাসুদ করিম এই প্রতিবেদককে বলেন, আমাদের কাছে গণমাধ্যম সম্পর্কে জানতে চেয়েছে, গণমাধ্যমের পরিস্থিতি কী, কী কী চ্যালেঞ্জ আছে, নির্বাচন কাভার করতে কী কী প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে হয়, সুবিধা-অসুবিধা কি এগুলো জানতে চেয়েছে। আমরা বলেছি যে আমাদের থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের গণমাধ্যমকর্মীদের বেশি সমস্যা হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সমস্যা হয়। নির্বাচনের পরিবেশ আরো উন্নত করতে হবে বলে বলেছি। যেমন ভোটের মাঠে ইন্টারনেট সেবার মান আরো উন্নত হওয়া জরুরি। আমাদের এখানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকলেও বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ আছে, যেমন মিডিয়া মালিক, সরকার, নিরাপত্তা সংস্থা ইত্যাদি। রাজনৈতিক দলের সদস্যরা অনেক সময়ে আক্রমণ করে বসে, এটা একটা বাজে দিক। নির্বাচনের আগের এবং পরের পরিবেশ নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদেরও কাজ করায় দক্ষতার ঘাতটি আছে। তিনি আরো বলেন, ইউরোপিয় পার্লামেন্ট বিগত ২০১৪ সালে জামায়াতে ইসলামীকে কালা তালিকাভূক্ত করেছে, এই তথ্য দিয়ে তাদের কাছে জানতে চেয়েছি যে তারা কেন এই দলটির সঙ্গে বৈঠক করল। জবাবে তারা বলেছে যে তারা সকলের সঙ্গেই কথা বলছে।
চ্যানেল টুয়েন্টি ফোরের জেষ্ঠ্য প্রতিবেদক মোরশেদ হাসিব এই প্রতিবেদককে বলেন, আমাদের কাছ থেকে মিডিয়া সম্পর্কে ইইউর দল জানতে চেয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে আমি তাদের বলেছি যে গুণগত মান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গত ১৪ ও ১৮ এর নির্বাচনের রিফ্লেকশনই দেখতে পাচ্ছি।
বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের পরিবেশ-পরিস্থিতি কেমন হতে পারে তা বোঝার জন্য ইইউর ৬ সদস্যের প্রাথমিক পর্যবেক্ষক দল গত ৯ জুন থেকে বাংলাদেশে প্রাথমিক অনুসন্ধানের কাজ শুরু করছে। ইইউর দলটি বাংলাদেশে ২ সপ্তাহ অবস্থান করবে। এরই মধ্যে এই দলটি আসন্ন নির্বাচন ইস্যূতে বিদেশি একাধিক রাষ্ট্রদূত, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন শৃঙ্খলায় নিয়োজিত পুলিশ বাহিনী, পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়, আওয়ামী লীগের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপ-কমিটি, নির্বাচন কমিশনের (ইসি), ইলেকশন মনিটরিং ফোরাম, এটর্নি জেনারেল কার্যালয়, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, আইন ও বিচার বিভাগের সচিব মো. গোলাম সারওয়ার, বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাটিয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামি ও এবি পার্টির প্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজের ৬জন প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করেছেন ইইউর প্রাক নির্বাচনী দল। ২ সপ্তাহের পর্যবেক্ষণ শেষে ইইউর এই প্রাথমিক দলটি তাদের পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রধান জোসেফ বোরেলের কাছে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন জমা দিবে। ওই প্রতিবেদন সন্তোষজনক হলেই পরবর্তী সময়ে নির্বাচনে চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ দল বাংলাদেশে পাঠাবে ইইউ।
Leave a Reply