
অনলাইন ডেস্ক: বাজারে সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। আমদানি করা এবং দেশীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধিতে নাকাল দেশের মানুষ। এই অবস্থার মধ্যে বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল বাজেটে দাম কমানোর নানা উদ্যোগ থাকবে, বাজারে ফিরে আসবে স্বস্তি। কিন্তু বাজেটে পণ্যমূল্য কমানোর মতো কোনো পদক্ষেপ রাখেননি অর্থমন্ত্রী।
তাই বাজেটের পরদিন শুক্রবার বাজারে কোনো পণ্যের দাম তো কমেইনি, উল্টো আরও বেড়েছে। অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজেটে তো পণ্যমূল্য কমানোর কোনো ব্যবস্থাই রাখা হয়নি-তা হলে কমবে কীভাবে। তবে ভোক্তার প্রশ্ন-বেসামাল বাজারে পণ্যমূল্য কমবে কি?
তবে গতকাল বাজেটের পরদিন বিক্রেতারা বলেছেন তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। বাজেটের পর কোম্পানিগুলো নতুন করে কোনো পণ্যের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় কি না।
গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায় আগের সেই চড়া দামেই বিক্রি হচ্ছে নিত্যপণ্য। কয়েক দিনের মধ্যে দাম আরও বাড়তে পারে বলে শঙ্কা করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগের কেনা পণ্য থাকায় দাম বাড়েনি, তবে নতুন পণ্য বাজারে এলে দাম বাড়বে। শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার ঘুরে কমতে দেখা যায়নি কোনো পণ্যের দাম। এখনও তেল, চিনি, পেঁয়াজ, আদা, ডিমসহ মাছ-মাংসের দাম অস্থিতিশীল।
বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২১০ টাকায়। পাকিস্তানি কক মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা কেজি। আকার ভেদে সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকা।
কারওয়ান বাজারে কেনাকাটা করতে আসা বেসরকারি আইটি ফার্মের কর্মচারী শহিদুল ইসলাম বলেন, বাজেট আসে যায় আমাদের কী? আমাদের মতো স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য তো আর তেমন কিছু থাকে না, সব বড় বড় ব্যবসায়ীর জন্য থাকে। সে জন্য বাজেট নিয়ে মাথা ঘামাই না। দাম বাড়লে বেশি টাকা দিয়ে কিনতে হবে, কমলে কম টাকা দিয়ে কিনতে হবে। আমাদের দুঃখ কেউ দেখবে না। তাই এগুলো বলে লাভ নেই।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, বাজেটে এমন কিছু নেই যেটা বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমাতে পারে। এ মুহূর্তে মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষ কষ্ট করছে। বাজেটে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৬ শতাংশের কাছাকাছি নিয়ে আসা হবে বলে অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন। তবে এটি কীভাবে কমানো হবে তা পরিষ্কার হয়নি। আমি মনে করি, এ বাজেটে যে বড় ঘাটতি ধরা হয়েছে তার অর্থায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যে ঋণ নেওয়া হবে তা উল্টো মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে দেবে।
কারওয়ান বাজারের খুচরা দোকান থেকে তেল, চাল ও ডাল কিনেছেন বেসকারি চাকরিজীবী সাব্বির আহমেদ। তিনি বলেন, চাল প্রতি কেজি ৬০ টাকা, তেল ১ লিটার ১৯০ এবং মোটা ডাল ১০৫ টাকা কেজি দরে কিনেছি। দোকানদার বলেছে বেশি করে নিয়ে যান, আগের কেনা বলে আজকে দাম কম আছে। দুই দিন পর নতুন মাল এলে দাম বাড়বে। বাজেটের কারণে এসব জিনিসের দাম বেড়ে যাবে।
প্রায় একই কথা বলেন ভাই ভাই ট্রেডার্সের সোহেল রানা। তিনি বলেন, বাজেটের কারণে বাজারে এখনও কোনো কিছুর দাম বাড়েনি। আমরা যেসব মাল বিক্রি করছি এগুলো আগের কেনা। নতুন পণ্য এলে তখন বোঝা যাবে দাম কেমন। আমরা বেশি দামে কিনলে বেশি দামে বিক্রি করি, কম দামে পেলে কম দামে বিক্রি করি। দাম বাড়ানো-কমানো আমাদের হাতে হয় না। বড় বড় কোম্পানি দাম বাড়ায়।
রাজধানীর মহাখালী কাঁচাবাজারে আসা আবদুর রহিম মিয়া বলেন, সবজির দাম প্রায় বছর খানেক ধরেই চড়া। ৫০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই, ওপরে আছে ৭০-৮০ টাকা। মাছ, মাংসের এত দামের মধ্যে সবজি কিনে যে খাব সেই সুযোগও নেই।
অন্যদিকে ঝাল কমছে না কাঁচা মরিচের। প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ১২০-১৩০ টাকা। আলুর দামও চরা। কেজি প্রতি আলু বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। সবজির বাজারের সেই পুরোনো চিত্র। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি গোল বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০, লম্বা বেগুন ৪০ থেকে ৫০ , ঢেঁড়শ ৫০ থেকে ৫৫, করলা ৫০ থেকে ৬০ , চিচিঙ্গা ৫০, পটোল ৫০ থেকে ৫৫ এবং কচুর লতি ৭০ থেকে ৮০ টাকা।
আলু এখনও প্রতি কেজি ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একই অবস্থা পেঁয়াজ ও আদার দামেও। প্রতি কেজি পেঁয়াজ বাজারভেদে ৭৫ থেকে ৮৫ টাকা আর আদার দাম বাড়তে বাড়তে ৩২০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি পর্যন্ত উঠেছে।
বাজারে বাগদা চিংড়ি ৮০০, গলদা চিংড়ি ১ হাজার ১০০, চিংড়ি (মাঝারি) ১ হাজার ৩০০, প্রতি কেজি পাবদা ৫৫০, শিং মাছ কেজি ৬০০ , টেংরা ৭০০, বোয়াল ৬৫০, পাঙাশ ৩৫০, চাষের কই প্রতি কেজি ৭৫০, দেশি কই ৭০০, তেলাপিয়া ৪০০, রুই মাছ ৩৫০ এবং কাতল ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মাছ বিক্রেতা শাহেদ আলী বলেন, দেশি নদীর মাছ বাজারে এখন কম আসছে। চাহিদাও বেশি, তাই দেশি সব মাছের দাম বর্তমানে কিছুটা বেশি।
গত সপ্তাহে প্রতি ডজন ফার্মের মুরগির ডিম ১৩০-১৩৫ টাকায় বিক্রি হলেও এ সপ্তাহে ১০-১৫ টাকা দাম বেড়ে এলাকা ভেদে প্রতি ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৪০-১৪৫ টাকায়। আর হাঁসের ডিম প্রতি ডজন ১৮০-২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি মুরগির ডিম প্রতি ডজন ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। এবারের বাজেটে যদিও বলা হচ্ছে মূল্যস্ফীতি কমবে, কিন্তু কার্যত তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। যার ফলে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম খুব একটা কমতে পারে বলে মনে হয় না। কারণ যে বাজেট দেওয়া হয়েছে সেটার ঘাটতি অনেক বড়। বাজেট ঘাটতির অর্থায়নের যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে সেটা হচ্ছে যে এক-তৃতীয়াংশের মতো বৈদেশিক সহায়তা আসবে এবং দুই-তৃতীয়াংশ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আসবে। অভ্যন্তরীণ যেটা নেওয়া হবে সেটা যদি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া হয় তা হলে সেটা মূল্যস্ফীতির জন্য খুবই ভয়াবহ হবে। মূল্যস্ফীতিকে অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে। সুত্র: সময়ের আলো
Leave a Reply