
অনলাইন ডেস্ক:দেশে হঠাৎ বন্যার বিপর্যয়ে দিশেহারা মানুষ। বন্যা দুর্গতদের সাহায্যে সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছেন। উদ্ধার, চিকিৎসা, খাদ্য ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে বাহিনীগুলো। দেশের ১১ জেলায় ভয়াবহ বন্যার মধ্যে জরুরি উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি ত্রাণ বিতরণে অংশ নিচ্ছেন বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড (বিসিজি) এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা। র্যাব তাদের হেলিকপ্টার নিয়ে ফেনীতে আটকে পড়া বন্যা দুর্গতদের উদ্ধার ও ত্রান বিতরণ কার্যক্রমে যোগ দিয়েছে। এদিকে বিজিবি তাদের অন্যান্ন কার্যক্রমের পাশাপাশি বন্যার্তদের সহায়তায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের কাছে ৫০০টি পরিবারের মাঝে বিতরণের জন্য প্রয়োজনীয় ত্রাণ সামগ্রী হস্তান্তর করেছে। এছাড়া বন্যার্তদের সহায়তায় বিজিবির সকল সদস্য একদিনের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিলে দিয়েছে বিজিবি সদর দফতর।
১১ জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪৫ লাখ। এই মুহূর্তে ৮ লাখ ৮৭ হাজার ৬২৯টি পরিবার পানিবন্দী। আর এই বন্যায় এখন পর্যন্ত ১৩ জন মারা গেছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুল হাসান শুক্রবার (২৩ আগস্ট) দুপুর ১২টার পর সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।
পুলিশের জেলাভিত্তিক কার্যক্রম: বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। প্রয়োজনীয় সহযোগিতার জন্য যোগাযোগ করুন জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এর পাশাপাশি জেলাভিত্তিক যোগাযোগের জন্য কিছু ফোন নম্বর দিয়েছে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স। নম্বর গুলো হচ্ছে- নোয়াখালী জেলা পুলিশ +8801320111898, লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ +8801320112898, ফেনী জেলা পুলিশ +8801320113898, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ +880 1320-115898, কুমিল্লা জেলা পুলিশ +880 1320-114898, চাঁদপুর জেলা পুলিশ +8801320116898, রাঙ্গামাটি জেলা পুলিশ +8801320109898, বান্দরবান জেলা পুলিশ +8801320110898, খাগড়াছড়ি জেলা পুলিশ +8801320110398, চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ +8801320108398, কক্সবাজার জেলা পুলিশ +8801320109398, মৌলভীবাজার জেলা পুলিশ +880 1320-120698, হবিগঞ্জ জেলা পুলিশ +880 1320-119698।
র্যাবের হেলিকপ্টারে পানিবন্দীদের উদ্ধার: চলমান বন্যা পরিস্থিতির শুরু থেকেই র্যাবের পক্ষ থেকে বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার (২৩ আগস্ট) ফেনী জেলার বিভিন্ন এলাকায় র্যাবের পক্ষ থেকে পাঁচশতাধিক বন্যার্তদের শুকনো খাবার,পানি বিশুদ্ধকরণ টেবলেট, খাবার সেলাইন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণ করা হয়। এর পাশাপাশি ফেনীর পশুরাম সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ১ জন গর্ভবতী নারী ও ২ জন নবজাতক শিশুকে উদ্ধার করে অক্সিজেন সাপোর্টের মাধ্যমে সুস্থ্য করে তাদেরকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয়। এছাড়াও নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ বন্যা দুর্গত এলাকা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা পানিবন্দীদের র্যাবের হেলিকপ্টারের মাধ্যমে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা হচ্ছে। এছাড়াও অনেক পানিবন্দী মানুষ যারা ত্রাণ পাচ্ছিলেন না এধরণের অসহায় মানুষদেরকে খুঁজে বের করে র্যাবের পক্ষ থেকে ত্রাণ সহায়তা দেয়া হচ্ছে।
বন্যা এবং বন্যা পরবর্তী সময়ে খাদ্য সংকট, পানীয় জলের দুষ্প্রাপ্যতা এবং বিভিন্ন ধরণের পানিবাহিত রোগের ব্যাপারে র্যাব ফোর্সেস জনমানুষের পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছে। এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে বাহিনীটি। বন্যা পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে কেউ যেন আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে না পারে সেজন্য নিয়মিত টহল কার্যক্রমের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি বন্যা দুর্গতদের সহায়তার জন্য সরকারী-বেসরকারী বিভিন্ন সংস্থাসহ দেশের সকল বিত্তবানদেরকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়ার জন্য র্যাবের মহাপরিচালক আহবান করেছেন। বন্যার্তদের মানবিক সহায়তাসহ যে কোন মানবিক প্রয়োজনে সকলকে সংশ্লিষ্ট র্যাব কন্ট্রোলরুমের সঙ্গে (০১৭৭৭৭১০৭৯৯) যোগাযোগের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
বিজিবি সদস্যদের একদিনের বেতন প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিলে: শুক্রবার শ্রীমঙ্গল ব্যাটালিয়ন (৪৬ বিজিবি) আওতাধীন মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার মোকাবিল, কুরমা ও চাম্পাপাড়া সীমান্তবর্তী এলাকায় ৬০০ এর বেশি পরিবারের মাঝে শুকনা খাদ্য, বিনামূল্য চিকিৎসা এবং ঔষধ সামগ্রী বিতরণ করেছে। খাদ্য এবং চিকিৎসা সামগ্রী বিতরণ করেন শ্রীমঙ্গল ব্যাটালিয়নের (৪৬ বিজিবি) অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। এদিকে শুক্রবার মারিশ্যা ব্যাটালিয়ন (২৭ বিজিবি) এলাকায় ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলের কারণে মুসলিম ব্লক সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, মুসলিম ব্লক হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা এবং উপজেলা এডমিনিস্টেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজে আশ্রয় নেয়া ৫২০ জন বন্যার্ত পরিবারের সদস্যদের মাঝে রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়াও মারিশ্যা ব্যাটালিয়নের (২৭ বিজিবি) মেডিকেল অফিসার মেজর গাজী মো. হাসান মুসলিম ব্লক সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয় কেন্দ্রে পুরুষ-৩৬, মহিলা-৩৩ এবং শিশু-৪৫ জনসহ মোট ১১৪ জন বন্যার্ত পরিবারের অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসা সেবা ও বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ করেছে। এর আগে গত ২২ আগস্ট মুসলিম ব্লক এলাকার আরিফ হোসেনের গর্ভবতী স্ত্রী রাজিয়া খাতুনকে (৩০) মারিশ্যা ব্যাটালিয়নের উপ অধিনায়ক মেজর নোমান আল ফারুকের নেতৃত্বে বিজিবি টহলদল উদ্ধার করে বাঘাইছড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে ওই নারী পুত্র সন্তান প্রসব করেন। বর্তমানে মা ও শিশু সুস্থ আছেন।
শুক্রবার বন্যার্তদের সহায়তায় বিজিবির সকল সদস্যের একদিনের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিলে দিয়েয়েছে বিজিবি সদর দফতর। এদিকে বন্যার্তদের সহায়তায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের কাছে ৫০০টি পরিবারের মাঝে বিতরণের জন্য প্রয়োজনীয় ত্রাণ সামগ্রী হস্তান্তর করেছে বিজিবি সদর দপ্তর। শুক্রবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর পক্ষে বিজিবি সদর দপ্তরের পরিচালক লে. কর্নেল মীর মনোনয়ার আলী ছাত্র সমন্বয়কদের কাছে ত্রাণ সামগ্রী হস্তান্তর করেন। এ সময় তিনি বলেন, বিজিবি মহাপরিচালক ছাত্র সমন্বয়কদের এ মহতী উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন এবং ভবিষ্যতেও এধরনের মহৎ কাজে ছাত্রদের পাশে থাকবে।
ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার করেছে ৭৭৯ জনের বেশি: বন্যাকবলিত এলাকা ও সেখানকার উদ্ধারকাজ পরিদর্শন করেছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন। শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে দিনব্যাপী তিনি বন্যাকবলিত ফেনী ও তার আশপাশ এলাকা ঘুরে দেখেন। সেখানে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার কাজ পর্যবেক্ষণ করেন এবং বিভিন্ন পয়েন্টে বন্যা কবলিতদের মাঝে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করেন। ২১ আগস্ট থেকে ২৩ আগস্ট বিকেল ৪টা পর্যন্ত দুর্গত এলাকার বিভিন্ন স্থানে আটকে পড়া ৭৭৯ জন নারী-পুরুষ ও শিশুকে উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তর করেছে ফায়ার সার্ভিস। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেইনেন্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল থেকে ফায়ার সার্ভিস এর ৯টি টিম বন্যা দুর্গত এলাকায় উদ্ধার কাজ ও ত্রাণ সামগ্রী প্রদানের কাজ করছে।
উদ্ধারে কোস্ট গার্ডের ডুবুরিদলও: ফেনী জেলার বন্যার্তদের উদ্ধার ও ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। শুক্রবার (২৩ আগস্ট) সকালে কোস্ট গার্ড সদর দপ্তরের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ফেনীতে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। ফেনী বন্যা কবলিত পানি বন্দীদের উদ্ধার ও সার্বিক সহায়তা দেয়ার পাশাপাশি খাদ্য ও বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ করছে কোস্ট গার্ড। পানি বন্দীদের উদ্ধার করে আশ্রয় কেন্দ্রে পৌঁছে দিচ্ছে কোস্ট গার্ডের ডুবুরিদল।
আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর কার্যক্রম: বন্যার পানিতে আটকে পড়া সাধারণ মানুষকে উদ্ধারে স্পিডবোট ও নৌকা নিয়ে উদ্ধারে নেমেছে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা। বানভাসি এসব মানুষের উদ্ধার করে নিরাপদে আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে আসা, তাদের খাদ্য সহায়তা নিশ্চিতসহ সার্বিক সহযোগিতায় নিরলসভাবে কাজ করছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। এক বিজ্ঞপ্তিতে বাহিনীটি জানায়, কক্সবাজার জেলা জুড়ে প্রবল বর্ষণ হচ্ছে। এখনো পর্যন্ত কোথাও কোনো পাহাড় ধ্বসের ঘটনা ঘটেনি। বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা জনগণকে সতর্কতার সহিত নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে উদ্বুদ্ধ করছে। ভূমি বা পাহাড় ধসের হাত থেকে বাঁচতে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করছে। বন্যা প্লাবিত এলাকা থেকে মানুষকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিতে সহায়তা করছে। সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ কমান্ডার ও জেলা কমান্ড্যান্টরা ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড দলনেতা-দলনেত্রী, উপজেলা ও ইউনিয়ন আনসার কমান্ডার ও সহকারী আনসার কমান্ডারদের বন্যা মোকাবিলায় শুরু থেকেই সম্পৃক্ত করেছেন। তারা সম্মিলিতভাবে বন্যা দুর্গতদের তাদের গবাদি পশু ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পত্তিসহ নিরাপদে আশ্রয় কেন্দ্রে স্থানান্তরে সহায়তা করছেন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছেন।
Leave a Reply