
অনলাইন ডেস্ক:‘আপনার আবেদন মঞ্জুর হয়েছে, প্রতিদিন ৩ হাজার ৫০০ টাকা বেতন পাবেন।’ ‘বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন ডব্লিউএ.মি অথবা ০১৭০৯৪৬৪০০৩ নম্বরে।’ গত বৃহস্পতিবার ঢাকার এক ব্যবসায়ীর কাছে এমন এসএমএস আসার পর বিষয়টি গোয়েন্দাদের কাছে পাঠিয়ে দেন ওই ব্যবসায়ী। অথচ ওই ব্যবসায়ী জানেন না তিনি চাকরির জন্য কোনো আবেদন করেছেন। মৃত ব্যক্তির সিম ব্যবহার করে এবং রেজিস্ট্রেশনবিহীন নম্বর দিয়ে হাজার হাজার এসএমএস পাঠিয়ে চাকরির অফার দিচ্ছে চক্রটি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই চক্র যেভাবে প্রতারণা করছে সেটি ‘বাতাসের গলায় ফাঁসির সামিল’।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দারা খোঁজ নিয়ে দেখেন, নম্বরটি চট্টগ্রামে রেজিস্ট্রেশন করা। বর্তমান ঠিকানা ঢাকার মোহাম্মদপুরে। যে নম্বরটি দেওয়া হয়েছে সেটির ব্যবহারকারী একজন তরুণ। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সময়ের আলোকে বলেন, আমি ফ্রিল্যান্সার হিসেবে অনলাইনে কাজ করি। সম্প্রতি ওই নম্বরে ২২ হাজার টাকা বিকাশের মাধ্যমে আসে। অনলাইনের মাধ্যমে কিছু টাকা কমিশন নিয়ে ক্রিপ্টোকারেন্সির (বিটকয়েন) মাধ্যমে ওই টাকা পাঠিয়ে দেই। যিনি টাকাগুলো নিয়েছেন তাকে তিনি চেনেন না বলে জানান। অনলাইনে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজের ক্ষেত্রে কিছু টাকা কমিশনের মাধ্যমে নিয়ে থাকেন বলে জানান ওই তরুণ। তিনি নিজেও জানেন না কোথা থেকে টাকা আসছে বা কোথায় যাচ্ছে সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই। টেলিগ্রামের মাধ্যমে যোগাযোগ করে ক্রিপ্টোকারেন্সি করে টাকাগুলো পাঠানো হয় বলে ওই তরুণ জানান। প্রায় একই এসএমএস পাঠিয়ে প্রতারণা করে আসছে অজ্ঞাতনামা প্রতারক চক্রটি। বাটন মোবাইলে এসএমএস পাঠিয়ে চক্রটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাপসের মাধ্যমে যোগাযোগ করে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। তবে গোয়েন্দারা চক্রটি শনাক্ত ও তদন্ত করতে গিয়ে এক পর্যায়ে আটকে যায়। কারণ যারা এই চক্রের হোতা তারা বিদেশে বসে কলকাঠি নাড়ছেন। এর কারণ হচ্ছে যিনি টাকাগুলো নিচ্ছেন, তিনি বিদেশে বসে একাধিক অ্যাপসের মাধ্যমে প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তরুণ ও বেকার তরুণদের চাকরি এবং অনলাইন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে চাকরির ফাঁদ তৈরি করে সর্বস্বান্ত করছে প্রতারক চক্রটি।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, প্রতিদিন এভাবে বেকার-তরুণদের টার্গেট করে প্রতারক চক্রটি হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। আরেকটি বাংলালিংক নম্বর দিয়ে একটি লিঙ্ক পাঠায় প্রতারক চক্রটি। ওই লিঙ্কে দেখা যাচ্ছে ‘আপনার সিভি পাস হয়েছে, আপনার মোবাইল নম্বর দিয়ে ০১৯৯৭৬৪৯৫৫৮ এই নম্বরে ওয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করুন। মাসে ২৫ দিন আপনি প্রতিদিন পাবেন ৩ হাজার ৫০ টাকা।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এই নম্বর ব্যবহার করছে একই হ্যাকার চক্র। তারা জানান, এই নম্বরটি মূলত একজন মৃত নারীর। ওই নারী মারা গেলেও তার সিমের মেয়াদ দেওয়া হয়েছে ২০২৫ সালে। চক্রটি ওই নারীর নম্বরে ওয়াটসঅ্যাপ খুলেছে এবং সম্পূর্ণ ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করেছে। যারা চাকরি প্রত্যাশায় প্রতারকদের খপ্পরে পড়ছে তারা টাকা খুঁইয়ে আর যোগাযোগ করতে পারছে না। অর্থাৎ টাকা নেওয়ার পর প্রতারণার শিকার ব্যক্তির মোবাইল নম্বর ব্লক করে রাখা হচ্ছে।
প্রতারকদের পাঠানো একটি এসএমএসের বিষয়ে জানতে চাইলে সোহরাব হোসেন নামে এক ব্যক্তি বলেন, আমাকে মোটা অঙ্কের টাকা ইনকামের জন্য বিভিন্ন অফার দিয়ে বেশ কয়েক দিন ধরে এসএমএস দিয়ে যাচ্ছে। আমি প্রতারণার বিষয়টা বুঝতে পারছি। সম্প্রতি এমন চক্রের কয়েকজনকে গ্রেফতারের পর বুঝতে পারছি এত টাকা বেতন দেওয়া অসম্ভব। তাই যে লিঙ্ক তারা পাঠিয়েছে সেখানেও ক্লিক করিনি। কারণ গোয়েন্দারা বিভিন্ন মিডিয়ায় বলেছেন ওইসব লিঙ্ক ক্লিক করলেই আমার মোবাইল ও নম্বর সব হ্যাক হবে। তিনি আরও বলেন, এসব অফার দেওয়া ব্যক্তিরা বাতাসের গলায় ফাঁসিতে ঝুলানোর মতো কাজ করছে। মানুষকে বোকা বানাতে গায়েবি প্রতারকরা এসএমএস দিয়ে যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (সাইবার অ্যান্ড ক্রাইম দক্ষিণ) মো. সাইফুর রহমান আজাদ সময়ের আলোকে বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক শিক্ষিত তরুণ এবং বেকার তরুণ অনলাইনে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করছে। এই সুযোগগুলো নিচ্ছে হ্যাকাররা। চক্রটি মোবাইল কোম্পানিগুলোর সিম ব্যবহার করে সেই সিম বাটন মোবাইলে ভরে বান্ডেল অফারে ৫-১০ হাজার এসএমএসের মাধ্যমে কিনে একবারে তা সেন্ড করছে। যারা প্রলুব্ধ হয়ে প্রতারকদের দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করছেন, তাদের টার্গেট করে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তিনি বলেন, মূলত প্রতারকরা টার্গেট করে অল্প শিক্ষিত, তরুণ ও বেকারদের। তারা হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে এবং পরবর্তী সময়ে ফাঁদে ফেলে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে সর্বস্ব কেড়ে নেয়।
মো. সাইফুর রহমান আজাদ আরও বলেন, প্রতারক চক্রটিকে প্রথমে টার্গেট করে তদন্ত শুরু করার পর শেষ পর্যন্ত তদন্ত আটকে যায়। কারণ যারা মোবাইল নম্বর ব্যবহারকারী তারা জানেনও না যে তার নম্বর দিয়ে প্রতারণা করা হচ্ছে। আর হোয়াটসঅ্যাপের নম্বরগুলো বেশিরভাগই ভুয়া। হ্যাকাররা বিদেশে বসে এই দেশের মানুষকে ফাঁদে ফেলছে। আর সাধারণ মানুষ তাদের ফাঁদে পা দিয়ে সর্বস্ব খোয়াচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এই চক্রের কোনো সদস্য দেশে থাকলে তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে। সুত্র:সময়ের আলো
Leave a Reply