
অনলাইন ডেস্ক: ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের (ডিএসএ)পুনর্মূল্যায়ন করার পক্ষে মত দিয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। একই সাথে রাষ্ট্রীয় সংবিধিবদ্ধ এ প্রতিষ্ঠানটি মনে করে, মূলত আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করা দরকার। মত প্রকাশের স্বাধীনতা সম্পর্কেও মতামত দিয়েছেন মানবাধিকার কমিশন।
এ ছাড়া হেফাজতে নির্যাতন এবং মৃত্যুর বিষয়ে বলেছেন, ডিএমপির সব থানায় রাতে দায়িত্ব পালন করা সেন্ট্রি ও অফিসারদের আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রকাশিত প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। প্রায় ৮৮ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা সংকট, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার পরিস্থিতি, নারীর প্রতি সহিংসতা, শিশু নির্যাতনসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ২০২১-২২ পর্যন্ত অভিযোগ পাওয়া গেছে ৫৯৮টি। বছর শেষে অনিষ্পন্ন ছিল ৩৬৪টি অভিযোগ। এসব অভিযোগ ৪৬ ধরনের। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-কাজের পরিবেশ, সম্পত্তি দখল, আর্থিক লেনদেন, পারিবারিক সমস্যা, মিথ্যা মামলা, পুলিশি নির্যাতন ও হয়রানি, যৌতুকের জন্য নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা, বিনাবিচারে আটক, নিরাপত্তা ও হুমকি, দুর্নীতি, আর্থিক লেনদেন, বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থার দৌরাত্ম্য, মত প্রকাশে বাধা, অপহরণ ইত্যাদি।
প্রতিবেদনে কয়েকটি উদাহরণ টেনে বেশ কিছু বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে নিরপরাধ ব্যক্তিদের গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো-সংক্রান্ত ঘটনায় মানবাধিকার কমিশন উল্লেখ করেছে, ভুল ব্যক্তিকে গ্রেফতারের ঘটনা খুলনা অঞ্চলে বারবার ঘটছে। এ অঞ্চলে বিশেষ নজরদারি রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট পুলিশ কমিশনার ও পুলিশ উপকমিশনারকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়ার জন্য জননিরাপত্তা সচিবকে সুপারিশ করা হয়েছে।
পুলিশ যেন কোনো ব্যক্তির নামে কোনো ধরনের অমর্যাদাকর শব্দ জুড়ে না দেয় সে বিষয়টিও মানবাধিকার কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ ফাঁড়িতে ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ-সংক্রান্ত ঘটনায় অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের লঘু সাজা দেওয়া হয় বলে মন্তব্য করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এ সাজার বিষয়ে মানবাধিকার কমিশন স্পষ্ট বলেছে, অন্যায়ভাবে আটক ও হেফাজতে মৃত্যুর মতো গুরুতর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে যে সাজা দেওয়া হয়েছে তা যথেষ্ট নয়। কমিশন এ অস্বাভাবিক মৃত্যতে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হয়েছে বলে মনে করে। একই সঙ্গে এটি ফৌজদারি অপরাধ হয়েছে বলে মনে করে। তাই এ ঘটনায় অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়েরের সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
পুলিশের সোর্স ব্যবহার নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দিয়ে সুপারিশ কার্যকর করার বিষয়ে গুরুত্ব দেয় মানবাধিকার কমিশন তদন্ত কমিটি। এ সংক্রান্ত বিষয়গুলো স্পট করার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এর মধ্যে রয়েছে সাদা পোশাকে গ্রেফতার, গণমাধ্যেেমর ক্যামেরায় প্রকৃত ঘটনা সুস্পষ্ট হয়ে উঠলেও কেন নিরীহ নিরপরাধ ব্যক্তিকে হয়রানি বা অপরাধী করা। এ ধরনের ক্ষেত্রে পুলিশ হেফাজতে আটকে রাখার সমালোচনাও করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে মায়ের জানাজায় হাতকড়া ও ডান্ডাবেড়ি পরানোর ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে মানবাধিকার কমিশন। এ ঘটনায় কমিশন তাদের মতামত প্রকাশ করে বলেছে, ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনপূর্বক প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার পরও ডান্ডাবেড়ি পরানো রীতিমতো বাংলাদেশের সংবিধান ও মৌলিক মানবাধিকার পরিপন্থি। ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে মায়ের জানাজায় অংশগ্রহণ করানো অত্যন্ত অমানবিক।
কমিশন তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশের মতো একটি অসাম্প্রদায়িক দেশে সাম্প্রদায়িক হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে কোনো ধর্মকে অবমাননা করার অধিকারও কারও নেই।
কমিশন তাদের প্রতিবেদনে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণার একটি চিত্র তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে-পাবলিক ও প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে সেবা নিতে আসা প্রবীণদের অগ্রাধিকার দেওয়া। তাদের জন্য আলাদা কাউন্টারের ব্যবস্থা রাখা।
কমিশন ২০২১-২২ পর্যন্ত যেসব অভিযোগ দাখিল করেছে তার মধ্যে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি, এমন সংখ্যা ৬টি। কমিশন সন্তুষ্ট না হয়ে আবার প্রতিবেদন চেয়েছে এ সংখ্যা ১৫। আর ১৩টি অভিযোগ বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হলেও তার কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন।
Leave a Reply