
অনলাইন ডেস্ক:পবিত্র রমজান আত্মশুদ্ধি অনুশীলনের মাস। দিনভর উপবাস ও রাত জেগে আমলের মাধ্যমে মুমিন বান্দা অন্তরের পরিশুদ্ধি অর্জনের বিশেষ সুযোগ লাভ করেন। শরীরকে শক্তিশালী করতে যেমন ব্যায়াম করতে হয়- তেমনি আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য প্রয়োজন সংযম সাধনা। রোজা পালনে শারীরিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ব্যবহারের চেয়ে মনের প্রকৃতি, প্রবৃত্তি ও কামনা-বাসনা নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বই অনেক বেশি। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) রোজাকে দেহের জাকাত বলে আখ্যায়িত করেছেন। রোজা দ্বারা শরীর, মন ও আত্মা বিধৌত হয়। দেহ যখন সংযমের শাসনের অধীন থাকে, আত্মা তখন সবল হয়ে ওঠে। সিয়াম সাধনায় কুপ্রবৃত্তিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। মানুষের ভেতর লুকোনো পাশবিক শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে না।
আত্মা মানুষকে পাপাচারের দিকে পথনির্দেশনা দেয়। রোজাদারদের আত্মাকে সৎপথে পরিচালিত করার দ্বারা প্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচরণ হবে। অন্তর যদি গুনাহর দিকে আহ্বান করে, তা হলে সেই আহ্বানে সাড়া দেওয়া যাবে না। মাহে রমজানে সর্বদা হৃদয়কে কুচিন্তাভাবনা থেকে সংশোধিত রাখতে হবে। লোভ-লালসা, কামনা-বাসনা, রিপুর তাড়না, অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ, জুলুম-নির্যাতন ও অসামাজিক দুর্বৃত্তপনা পরিহার করে ধার্মিকতার পথে অগ্রসর হওয়ার মাধ্যমে অর্জিত হবে অন্তরের পরিশুদ্ধি। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই সাফল্য লাভ করবে যে পবিত্রতা অর্জন করে।’ (সুরা আলা, আয়াত : ১৪)
কুপ্রবৃত্তিগুলো সবল ও সতেজ থাকলে সুপ্রবৃত্তিগুলো মৃতপ্রায় হয়ে যায়। মানুষের ঈমান যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, শয়তান তখন তার ওপর প্রভাব বিস্তার করে। কুপ্রবৃত্তির তাড়নায় তখন মানুষ পাপের পথে ধাবিত হয়। তখন পরম দয়ালু আল্লাহ মেহেরবান তাদের আত্মশুদ্ধির দিকনির্দেশনা দেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো, বিশুদ্ধ তওবা; সম্ভবত তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের মন্দ কর্মগুলো মোচন করে দেবেন’ (সুরা তাহরিম, আয়াত : ৮)। আত্মশুদ্ধির মাসে মানবীয় মন্দ স্বভাবগুলো থেকে বিরত থাকা রোজা আদায়ের জন্য শর্তারোপ করা হয়েছে। তাই রমজান মানুষকে এসব মন্দ স্বভাব পরিহার করে সৎ স্বভাব অর্জন করতে শিক্ষা দেয়।
অন্তরের বিশুদ্ধতা বা আত্মশুদ্ধি রোজা দ্বারা অর্জিত হয়। মাহে রমজানে আত্মশুদ্ধির বিরাট সুযোগ থাকলেও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নৈতিক অধঃপতন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সামাজিক সমস্যা ও গণসচেতনতার অভাব প্রভৃতি সেই আত্মশুদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হলে সমাজের প্রত্যেক রোজাদার মানুষকে সৎ মনোভাবাপন্ন, নির্লোভ, মহৎ ব্যক্তিত্ববান হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। মানুষ যখন কোনো পাপকাজ বা দোষ-ত্রুটি করে, তখন তার অন্তরে কালিমা বা মরিচা পড়ে। মানুষ যত বেশি পাপকাজ করতে থাকে, তার অন্তরে পাপের কালিমা তত বেশি পতিত হয়। এই পাপের মরিচা থেকে আত্মশুদ্ধি তথা অন্তরকে স্বচ্ছ ও পরিষ্কার রাখার একমাত্র পন্থা হলো আল্লাহর স্মরণ। মানুষ যতই আল্লাহর জিকির-আজকার, ইবাদত-বন্দেগি, নামাজ-রোজা পালন করবে, তার অন্তর থেকে ততই পাপ মুছে যাবে এবং সে পাপমুক্ত হবে।
সিয়াম সাধনায় মানুষের প্রবৃত্তি যখন দমে যায়, তখন আত্মার তেজ ও প্রাণশক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে। রোজার দ্বারা মানুষের আত্মার উন্নতি সাধিত হয়। আধ্যাত্মিক শক্তি বৃদ্ধির কারণে ক্ষুধার জ্বালা রোজাদারকে কাবু করতে পারে না। রোজাদার তার ঈমানের শক্তি বৃদ্ধির ফলে সব ধরনের খাবার সামনে থাকা সত্ত্বেও আহার করেন না, এ জন্য তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় পানাহার বর্জন করে থাকেন। রোজা পালনের মধ্য দিয়ে মানুষ অন্তরকে পরিপূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে অভ্যস্ত হয়। আসলে রোজা হলো আত্মশুদ্ধি অনুশীলনের মাস, দেহ-মনের পবিত্রতা অর্জনের বসন্ত মৌসুম।
Leave a Reply