
অনলাইন ডেস্ক: বর্তমানে পুরো বিশ্ব বিভিন্ন সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আকাশছোঁয়া। সাধারণ জনগণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। নুন আনতে তাদের পান্তা ফুরায় অবস্থা। সন্দেহ নেই, অনাকাক্সিক্ষত এ দুরবস্থা, অর্থনৈতিক সংকট, দুর্যোগ ও আগ্রাসন আমাদের কিছু মানুষের কর্মফল ও হাতের কামাই। এসবের প্রকৃত কারণ, ব্যাপক হারে আল্লাহ তায়ালার বিধান লঙ্ঘন করা ও পাপাচারে লিপ্ত হওয়া। প্রজ্ঞাময় আল্লাহ নানা বিপদ ও সংকট এ জন্যই দেন যে, যাতে বান্দার হৃদয় আল্লাহর ভয়ে ও স্মরণে বিগলিত হয় এবং গুনাহ থেকে নিবৃত্ত হয়।
পবিত্র কুরআনের মর্মস্পর্শী বাণী, ‘মানুষ নিজ হাতে যা কামায়, তার ফলে স্থলে ও জলে অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কতক কৃতকর্মের স্বাদ গ্রহণ করাবেন সে জন্য; হয়তো এর ফলে তারা ফিরে আসবে’ (সুরা রুম : ৪১)। অতএব এই সংকটপূর্ণ সময়ে ঈমানদার হিসেবে এমন কিছু আমল করা চাই, যা আমাদের জীবনে বয়ে আনবে কল্যাণ, বরকত এবং সমৃদ্ধি। বাড়াবে রিজিক, কমাবে দুশ্চিন্তা।
রিজিক খোলার চাবি
মানুষের পাপের কারণে নেমে আসে অশান্তির কালো ছায়া। জলে-স্থলে ছড়িয়ে পড়ে নানা দুর্যোগ ও বিপর্যয়। এসবের মাধ্যমে আল্লাহ পাক আমাদের তওবা করার বার্তা দেন। তাঁর কাছে ফিরে আসার আহ্বান জানান। তাঁর দুয়ারে ধরনা দিতে বলেন। পবিত্র কুরআনের বাণী, ‘আমি তাদেরকে বলেছি নিজ প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চিতভাবে তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল। তিনি আকাশ থেকে তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে উন্নতি দান করবেন। আর তোমাদের জন্য সৃষ্টি করবেন উদ্যান এবং তোমাদের জন্য নদ-নদীর ব্যবস্থা করবেন’ (সুরা নুহ: ১০-১২)। মুমিন জীবনে তাওবা এবং ইস্তিগফারের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। যেকোনো সংকট থেকে উত্তরণের অন্যতম উপায় হচ্ছে, আল্লাহর কাছে অবিরাম গুনাহ ক্ষমা চাইতে থাকা। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তিগফার পড়লে আল্লাহ তাকে প্রত্যেক বিপদ থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করবেন, সব দুশ্চিন্তা হতে মুক্ত করবেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করবেন, যা সে কল্পনাও করতে পারবে না।’ (আবু দাউদ : ১৫১৮)
রিজিক বৃদ্ধির মন্ত্রপাঠ
নামাজ আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্কের সেতুবন্ধন। পার্থিব প্রয়োজন ও চাওয়া পূর্ণ করার মন্ত্র। পরকালে মর্যাদা ও পুরস্কারের মাধ্যম। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর নিজ পরিবারবর্গকে নামাজের আদেশ করো এবং নিজেও তাতে অবিচল থাকো। আমি তোমার কাছে রিজিক চাই না। রিজিক তো আমি দেব। আর শুভ পরিণাম তো তাকওয়ারই’ (সুরা তোয়াহা: ১৩২)। তবে বান্দা হাত গুটিয়ে বসে থাকলেও হবে না। তাকে সাধ্যমতো উপায় উপকরণ অবলম্বন করতে হবে এবং রিজিক অন্বেষণে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। মনে রাখতে হবে, ইবাদতের পরিমাণ যত বাড়বে, রিজিকের পরিমাণ তত বৃদ্ধি পাবে।
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা (হাদিসে কুদসিতে) বলেন, হে আদম সন্তান, তুমি আমার ইবাদতের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করো। তা হলে আমি তোমার অন্তরকে ঐশ্বর্যে পূর্ণ করে দেব এবং তোমার অভাব দূর করে দেব। অন্যথায় আমি তোমার দুই হাত কর্মব্যস্ততায় পরিপূর্ণ করে দেব এবং তোমার অভাব-অনটন দূর করব না।’ (তিরমিজি : ২৪৬৬)
ঈমান ও তাকওয়া
আল্লাহর ওপর যথার্থ ঈমান, খোদাভীতি এবং তাঁর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস অহর্নিশি রিজিক বৃদ্ধি করে। খুলে দেয় আসমান ও জমিনের রিজিকের বদ্ধ দুয়ার। পবিত্র কুরআনের মর্মস্পর্শী বাণী, ‘যদি সেসব জনপদবাসী ঈমান আনত ও তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের জন্য আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী উভয় দিক থেকে বরকতের দরজাগুলো খুলে দিতাম। কিন্তু তারা সত্য প্রত্যাখ্যান করল। সুতরাং তাদের ক্রমাগত অসৎ কর্মের পরিণামে আমি তাদের পাকড়াও করি’ (সুরা আরাফ : ৯৬)। অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘যে কেউ আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার জন্য সংকট থেকে উত্তরণের পথ তৈরি করে দেবেন এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিজিক দান করবেন, যা তার ধারণার বাইরে। যে কেউ আল্লাহর ওপর নির্ভর করে, আল্লাহই তার (কর্ম সম্পাদনের) জন্য যথেষ্ট। নিশ্চিতভাবে জেনে রেখো, আল্লাহ তাঁর কাজ পূরণ করেই থাকেন। (অবশ্য) আল্লাহ সবকিছুর জন্য একটা পরিমাণ নির্দিষ্ট করে রেখেছেন।’ (সুরা তালাক : ২৩)
আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক
প্রত্যেকেই চাই, হায়াত বাড়াতে, জীবনে বরকত লাভ করতে এবং সম্পদের প্রাচুর্য গড়ে তুলতে। এসব পেতে হলে পিতামাতা, ভাইবোন তথা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। তাদের খোঁজখবর রাখতে হবে। তাদের হক যথাযথ আদায় করতে হবে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন হায়াতে বরকত ও কল্যাণ আসে, তেমনি রিজিকে প্রাচুর্য ও প্রশস্ততা আসে। বিশ্বমানবতার প্রকৃত বন্ধু প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে, তার রিজিক বৃদ্ধি হোক অথবা তার হায়াত দীর্ঘ হোক তবে সে যেন আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখে’ (বুখারি : ২০৬৭)। মনে রাখতে হবে, যে আত্মীয় আমার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখে তার সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রাখা অন্যথায় সম্পর্কছেদ করা-এটা প্রকৃত আত্মীয়তার হক সংরক্ষণ করা নয়। বরং সম্পর্কছেদকারী স্বজনের সঙ্গেও সুন্দর আচরণ করা ও আত্মীয়তার বন্ধন ঠিক রাখাই প্রকৃত আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা।
পাপাচারের বিরুদ্ধে শাসকের ভূমিকা
এসব আমলের পাশাপাশি বর্তমান সংকট নিরসনে রাষ্ট্রীয়ভাবে সকল ধরনের অনিয়ম, অপচয়, দুর্নীতি, পণ্য মজুদ এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নিরপেক্ষভাবে অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে। যাবতীয় পাপাচার, বেহায়াপনাকে লেজ গুটিয়ে তাড়াতে হবে। তা হলে আশা করা যায়, দেশে শান্তির সুবাতাস বইবে ইনশাআল্লাহ। স্মরণ রাখতে হবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেই স্মরণীয় বাণী, তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘শুনে রাখো, তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে’ (আল আদাবুল মুফরাদ: ২০৫)। দেশের প্রত্যেক নাগরিককেও সব ধরনের অপব্যয় থেকে বিরত থেকে অল্পে তুষ্টির সঙ্গে দিনাতিপাত করতে হবে।
তা ছাড়া স্বাবলম্বী ও সচ্ছল ব্যক্তিদের গরিব-দুঃখী ও দুস্থ মানবতার সেবায় এগিয়ে এসে তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়ানো বাঞ্ছনীয়। মহান আল্লাহ সবাইকে তাঁর অভিমুখী হওয়ার তওফিক দান করুন এবং সব সংকট থেকে উত্তরণ করে সুখময় ও স্বস্তিময় জীবন দান করুন।সুত্র:সময়ের আলো
Leave a Reply