
অনলাইন ডেস্ক: গত সোমবার তুরস্ক ও সিরিয়ায় ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছে। এতে নিহতের সংখ্যা ৫ হাজার ছাড়িয়েছে গেছে। ভূমিকম্পের পর থেকে দুটি দেশেই বড় ধরনের উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে। সোমবার স্থানীয় সময় ভোররাতে লোকজন যখন ঘুমিয়েছিল তখন তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চল ও সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়।
তুরস্কের দুর্যোগ সংস্থার বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, ভূমিকম্পে শুধু তুরস্কেই নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ৪০০ ছাড়িয়ে গেছে আর আহত ১৫ হাজারেরও বেশি।
প্রতিবেশী সিরিয়া জানিয়েছে, তাদের এখানে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৮০০ ছাড়িয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, নিহতের সংখ্যা আরও বাড়বে। দুই দেশ মিলিয়ে কয়েক হাজার ভবন ধসে পড়েছে। এসব ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া লোকজনের জীবন রক্ষার জন্য সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লড়ছেন উদ্ধারকারীরা। আক্রান্ত এলাকাগুলোতে এখন ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। রীতিমতো আতঙ্কের নগরীতে পরিণত বিপর্যস্ত শহর দুটি। স্বজন হারানো ব্যক্তিদের গগনবিদারী কান্নায় ভারী তুরস্ক ও সিরিয়ার আকাশ-বাতাস!
ভূমিকম্প মূলত একটি সতর্কবাণী। এর মাধ্যমে মহান আল্লাহ পৃথিবীবাসীকে সতর্ক করেন; যাতে তারা অনুতপ্ত হয় এবং আল্লাহর পথে ফিরে আসে। আল্লাহ বলে, ‘আমি ভয় দেখানোর জন্যই (তাদের কাছে আজাবের) নিদর্শনগুলো পাঠাই’ (সুরা ইসরা : আয়াত ১৭-৫৯)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘অচিরেই আমি আমার (কুদরতের) নিদর্শনগুলো দিগন্ত-বলয়ে প্রদর্শন করব এবং তাদের নিজেদের মধ্যেও (তা আমি দেখিয়ে দেব) যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের ওপর এটা পরিষ্কার হবে যে, এটাই (কুরআনই মূলত) সত্য। এ কথা কি যথেষ্ট নয়, তোমার মালিক সবকিছু সম্পর্কে অবহিত?’ (সুরা হা-মীম আস সিজদা : আয়াত-৫৩)। পবিত্র কুরআনে আরও বলা হয়েছে, ‘বলো, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ওপর থেকে (আসমান থেকে) অথবা তোমাদের পায়ের নিচ থেকে আজাব পাঠাতে সক্ষম অথবা তিনি তোমাদের দল-উপদলে বিভক্ত করে এক দলকে আরেক দলের শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাতেও সম্পূর্ণরূপে সক্ষম।’ (সুরা আল আনআম : আয়াত-৬৫)
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, নবী (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামত কায়েম হবে না, যে পর্যন্ত না ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে, অধিক পরিমাণে ভূমিকম্প হবে, সময় সংকুচিত হয়ে আসবে, ফেতনা প্রকাশ পাবে এবং হারজ (খুন-খারাবি) বৃদ্ধি পাবে। তোমাদের সম্পদ এত বৃদ্ধি পাবে যে, উপচে পড়বে।’ (বুখারি : হাদিস ৯৭৯)
পবিত্র কুরআনের একাধিক আয়াতে বলা হয়েছে, জলে-স্থলে যে বিপর্যয় সৃষ্টি হয় তা মানুষেরই কৃতকর্মের ফল। আল্লাহ পাক মানুষের অবাধ্যতার অনেক কিছুই মাফ করে দেন, তারপরও প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়। কুরআন নাজিল হওয়ার পূর্বেকার অবাধ্য জাতিগুলোকে আল্লাহ তায়ালা গজব দিয়ে ধ্বংস করেছেন। সেসবের অধিকাংশ গজবই ছিল ভূমিকম্প। ভূমিকম্প এমনই একটি দুর্যোগ যা নিবারণ করার মতো কোনো প্রযুক্তি মানুষ আবিষ্কার করতে পারেনি। এর পূর্বাভাস পাওয়ার মতো কোনো প্রযুক্তিও আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। হাদিস শরিফে একাধিকবার বলা হয়েছে, মানুষের দুষ্কর্মই ভূমিকম্পের মতো মহাদুর্যোগ ডেকে আনে। কুরআন এবং হাদিসে আদ, সামুদ, কওমে লুত এবং আইকার অধিবাসীদের ভূমিকম্পের দ্বারা ধ্বংস করার কাহিনি বিভিন্ন আঙ্গিকে বর্ণনা করা হয়েছে।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যখন অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জিত হবে, কাউকে বিশ্বাস করে সম্পদ গচ্ছিত রাখা হবে কিন্তু তার খেয়ানত করা হবে (অর্থাৎ যার সম্পদ সে আর ফেরত পাবে না), জাকাতকে দেখা হবে জরিমানা হিসেবে, ধর্মীয় শিক্ষা ছাড়া বিদ্যা অর্জন করা হবে, একজন পুরুষ তার স্ত্রীর আনুগত্য করবে কিন্তু তার মায়ের সঙ্গে বিরূপ আচরণ করবে, বন্ধুকে কাছে টেনে নেবে আর পিতাকে দূরে সরিয়ে দেবে, মসজিদে উচ্চস্বরে শোরগোল (কথাবার্তা) হবে, জাতির সবচেয়ে দুর্বল ব্যক্তিটি সমাজের শাসকরূপে আবির্ভূত হবে, সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি জনগণের নেতা হবে, একজন মানুষ যে খারাপ কাজ করে খ্যাতি অর্জন করবে তাকে তার খারাপ কাজের ভয়ে সম্মান প্রদর্শন করা হবে, বাদ্যযন্ত্র এবং নারী শিল্পীর ব্যাপক প্রচলন হবে, মদ পান করা হবে, শেষ বংশের লোকজন তাদের পূর্ববর্তী মানুষগুলোকে অভিশাপ দেবে; এমন সময় আসবে যখন তীব্র বাতাস প্রবাহিত হবে তখন একটি ভূমিকম্প সেই ভূমিকে তলিয়ে দেবে (ভূমি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে বা পৃথিবীর অভ্যন্তরে ঢুকে যাবে)’ (তিরমিজি : হাদিস ১৪৪৭)। এই হাদিসে বিস্তারিত বলা হয়েছে, জমিনে কখন ভূমিকম্প হয় এবং কেন হয়।
যখন কোথাও ভূমিকম্প সংঘটিত হয় অথবা সূর্যগ্রহণ হয়, ঝড়ো বাতাস বা বন্যা হয়, তখন মানুষদের উচিত পরাক্রমশালী আল্লাহর কাছে অতিদ্রুত তওবা করা। তাঁর কাছে নিরাপত্তার জন্য দোয়া করা। তাঁকে বেশি বেশি স্মরণ করা এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা; যেভাবে রাসুল (সা.) সূর্যগ্রহণ দেখলে বলতেন, ‘যদি তুমি এ রকম কিছু দেখে থাকো, তখন দ্রুততার সঙ্গে মহান আল্লাহকে স্মরণ করো। তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো’ (বুখারি : ২/৩০, মুসলিম : ২/৬২৮)। ছোট-বড় সব ধরনের বিপদে ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন’ এবং ‘আল্লাহুম্মা আজিরনি ফী মুসিবাতি ওয়া আখলিফু লী খাইরাম মিনহা’ দোয়া দুটি বেশি বেশি পাঠ করা।
আসলে জীবনটা এক মিনিটের ভরসা নেই। এই দেখুন তুরস্ক-সিরিয়ায় হাজার হাজার লোক মুহূর্তে চলে গেল। তাদের অনেকেই হয়তো বিরাট বিরাট স্বপ্ন দেখেছিলেন। জীবনে অনেক কিছু গড়া এবং করার কল্পনা করেছিলেন। কিন্তু কই? সবই তো পড়ে রইল; রইলা না শুধু ‘তারা’। তাহলে এতকিছু কেন? এত টাকা, এত পয়সা, এত বাড়ি-গাড়ি, পদ-পদবি কেন? যে জীবনের এক মিনিটের ভরসা নেই, সেখানে হাজার একটা রঙিন স্বপ্ন কোন ভরসায়?
আসুন, এখনই জাগ্রত হই। মিছে রঙিন দুনিয়া ভুলে ফিরে আসি মহান প্রভুর দরবারে। কায়মনোবাক্যে তওবা করি বিশ্ব মালিকের কাছে। অতীতের কৃতকর্মে লজ্জিত হয়ে আঁকড়ে ধরি দ্বীন-ইসলামের প্রতিটি আদেশ। ছেড়ে দিই শিরক, বেদাতসহ সব প্রকার পাপাচার। জীবনের পরতে পরতে মেনে চলি আল্লাহর নির্দেশ। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।
Leave a Reply