
নিজস্ব প্রতিবেদক: মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার পাটুরিয়া লঞ্চ ও ফেরি ঘাট এলাকায় পদ্মার ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে লঞ্চ ঘাট এবং ফেরি ঘাটের একাংশ নদী গর্ভে চলে গেছে। আশপাশেও নদী ভাঙ্গন অব্যাহত রয়েছে। পদ্মার ভাঙনে এলাকার লোকজনের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। ইতমধ্যে কয়েকটি বাড়ি-ঘর নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভিটে-বাড়ি হারিয়ে নি:স্ব হয়ে পড়েছে অনেকেই।ঘর-দরজাসহ বাড়ির আসবাব পত্র অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার চেষ্ট করছে তীরবর্তি এলাকার লোকজন। শিবালয়ের পাটুরিয়া ঘাট এবং আশপাশের পুরো এলাকাজুরে এখন চরম নদী ভাঙনে আতংক বিরাজ করছে।
জানা গেছে, শনিবার পাটুরিয়া ৪ নং ঘাট সংলগ্ন একটি বাড়ির অর্ধেক অংশ নদী গর্ভে চলে গেছে। ওই বাড়ির লোকজনকে ঘর-দরজাসহ আসবাবপত্র অন্যত্র সরিয়ে নিতে দেখা গেছে। গত কয়েকদিন ধরে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে স্রোতের কল কল শব্দে ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে পাটুরিয়া ফেরি ঘাটসহ পার্শ্ববর্তী শত শত পরিবারের বসতবাড়ি। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর বৃষ্টিপাতের পানি হু হু করে বাড়ছে পদ্মা-যমুনার পানি।এতে পাটুরিয়া ঘাটের বিভিন্ন অংশে আঘাত হানছে তীব্র স্রোতের ধাক্কা। ঘাট এলাকার নিচের মাটি পানির স্রোতে ধুয়ে গিয়ে ধসে পড়ছে পাড়। গত ৫ আগস্ট বিলীন হয়ে গেছে লঞ্চ ঘাট এবং গত ১২ আগস্ট ৪ ও ৫নং ফেরি ঘাটের একাংশ নদীতে ধসে পড়েছে। ৪ নং ফেরি ঘাট সংলগ্ন একটি বাড়িও নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার পথে। এভাবে নদী ভাঙ্গন অব্যাহত থাকলে এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পুরো ফেরি ঘাট ভেঙে গিয়ে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
পাটুরিয়া ঘাটের বাসিন্দা রানা সিকদার বলেন, পানি বৃদ্ধির শুরু থেকেই ঘাট এলাকায় নদী ভাঙ্গন দেখা দিলেও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। নদীতে পানি আসা মাত্রই ঘাট এলাকায় নদী ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। এতে ঘাট এলাকার আশপাশের গ্রামের অনেক পরিবার ও ফেরি ঘাট ক্ষতির মুখে পড়েছে। ভাঙ্গন রোধে আমরা এখনো পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো উদ্যোগ দেখিনি। সবকিছু বিলীন হওয়ার পর তারা পরিদর্শনে আসেন বলে জানান জানান।
আবেদ আলী বলেন, নদীর পানি বাড়া-কমার সময় সাধারণত নদী ভাঙন শুরু হয়। পাটুরিয়া ঘাট এলাকায় নদীতে ভাঙছে। ঘাট এলাকার বাড়ি-ঘড়তো ভেঙে যাচ্ছে। নদী ভাঙ্গনের কারণে এ এলাকার লোকজনের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।

স্থানীয় রফিকুল ইসলাম বলেন, শুস্ক মৌসুমে পাটুরিয়া ফেরি ঘাটের অদুরে নদীতে কাটার মেশিন বসিয়ে নদী হতে বালু তোলার কারণেই পাটুরিয়ায় নদী ভাঙ্গ দেখা দিয়েছে। ভেঙে গেছে যাত্রী তোলার জেটি ও লঞ্চ পন্টুন। এবার পাটুরিয়া ঘাট এলাকায় প্রচন্ড স্রোত এবং পানির গভীরতা অনেক বেশি। নদীতে কাটার মেশিন বসিয়ে বালু তোলার কারণেই গভীরতা বেশি এবং পানির ঘুর্ণি স্রোতের সৃষ্টি হয়ে নদীর তীরবর্তি এলাকায় ভাঙছে।। যার ফলে এই স্রোতে ও ভাঙনে পাটুরিয়া ফেরি ঘাট চরম হুমকির মধ্যে পড়েছে। এখনই কার্যকরী কোনো ব্যবস্থা না নিলে ঘাটটি অচিরেই বিলীন হয়ে যাওয়ার আশংকা করছেন তিনি।
তিনি আরো জানান, ঘাটের এমন নাজুক পরিস্থিতিতেও প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সরকারি ও টারমিনালের জমি হতে পাটুরিয়ায় চলছে অবৈধ বালু মাটির ব্যবসা। এসব রোধে প্রশাসনের তরফ হতে মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালনা করা হলেও তা নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। নদীর পাড় ঘেঁষে মাটি কাটার ফলে ঘাটটি পড়েছে চরম ঝুঁকিতে। যে কোনো সময় সম্পূর্ণ ঘাটটি ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতে পারে ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের।
সরজমিনে পাটুরিয়া ঘাট ঘুরে দেখা গেছে, পাটুরিয়া ফেরি ঘাটের আশপাশে বিআইডব্লিউটিএর ফোরসোর জায়গায় অন্তত পাঁচটি স্থানে অবৈধ বালুর চাতাল রয়েছে। নদীর তীরে এসব জায়গা থেকে বালু মাটি কেটে নেয়ার ধুম পড়েছে। সরকারি জায়গা অবৈধভবে দখল করে (এক্সক্যাভেটর) ভেকু মেশিনের সাহায্যে সরারাত নদী তীরবর্তী এলাকা থেকে বালু-মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই অবৈধভাবে বালু-মাটির ব্যাবসা করছে। বেপরোয়াভাবে বালু মাটি কেটে নেয়ায় চলতি বর্ষা মৌসুমে ব্যাপকভাবে নদী ভাঙনের শুরু হয়েছে।
শিবালয় মডেল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যা হাজী মো. আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, পাটুরিয়ায় অবৈধ বালু কাটা এবং তা বাজারজাত করার জন্য আমার ইউনিয়নের রাস্তাটি ব্যবহার করে ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে। এখন এই রাস্তা দিয়ে চলাচল দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে এবং সরকারি সম্পত্তিরও ক্ষতি হচ্ছে। এখনতো লঞ্চে যাত্রী উঠানামায়ও ভোগান্তি হচ্ছে। আমি এসব বিষয়ে বারবার প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেও কোনো ফল পাচ্ছি না।
মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বলেন, পাটুরিয়া ঘাটটা এবং লঞ্চ ঘাট এগুলো বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃক পরিচালনা করে থাকে নদী শাসন থেকে শুরু করে সবগুলোই করে থাকে। আমাদেরকে যদি কোন ইন্সট্রাশন দেয়া হয় আমরা অবশ্যই সহযোগীতা করবো, কারিগরি সহযোগীতা থেকে শুরু করে যে কোন ধরনের সহযোগীতা করতে প্রস্তুুত আছি আমরা।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নির্বাহী প্রকৌশলী নেপাল চন্দ্র দেবনাথ বলেন, পাটুরিয়া ঘাট নং ৫ এবং ৪ ল্যান্ডিং স্টেশনগুলি গুরুতর হুমকির মুখে রয়েছে। তিনি বলেন, জেটি ধসের পর তারা তাৎক্ষণিকভাবে ভাঙনস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনি আরও বলেন, ভাঙন নিয়ন্ত্রণের জন্য নদীতে ফেলার জন্য বর্তমানে পর্যাপ্ত জিও-ব্যাগের অভাব রয়েছে।
নদীর স্রোত খুব তীব্র এবং পানির স্তর উচ্চ। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারাও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ভাঙনের ক্রমবর্ধমান অবস্থার উপর ভিত্তি করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানান।
বাংলাদেশ অভ্যান্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) আরিচা নদীবন্দরের উপপরিচালক সেলিম শেখ বলেন, নদী ভাঙ্গনের ব্যাপারের পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং বিআইডব্লিউটিএ’র ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, পাটুরিয়া ঘাটে তাদের ফোরসোর জায়গায় অবৈধভাবে বালুর চাতাল করে বালু-মাটি বিক্রি করছে একটি চক্র। এসব অবৈধ বালুর চাতালের তালিকা করা হচ্ছে। খুব শিগ্রই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে তিনি জানান।
শিবালয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. জাকির হোসেন বলেন, প্রচন্ড শ্রোতের ফলে পাটুরিয়া লঞ্চ ঘাটের আশেপাশে নদীতে প্রচন্ড ভাঙ্গন হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড তারাও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পানির পরিমান করে জেলা প্রশাসক মহোদয়কে অবহিত হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ দ্রুতগতিতে জিও ব্যাগে বালু ভর্তি করে নদী ভাঙ্গন রোধে কাজ শুরু করেছে।
উল্লেখ্য, ২০০২ সালে বিআইডব্লিউটিএ আরিচা থেকে পাটুরিয়ায় ফেরি ঘাট স্থানান্তর করে। এতে রাজধানী ঢাকার সাথে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ২১টি জেলার মধ্যে যোগাযোগ সহজ হয়। কিন্তু বর্তমান এ নদী ভাঙন যদি নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তবে ফেরি ঘাট ও আশপাশের এলাকা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ শাহজাহান বিশ্বাস
অফিস : আরিচা, শিবালয়, মানিকগঞ্জ-১৮০০
মোবাইল : +৮৮০ ১৭১১ ৭৩৩ ৬৫১, ই-মেইল : sbnews74@gmail.com