অনলাইন ডেস্ক: নাগরিক নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সফররত মার্কিন প্রতিনিধি দল বুধবার কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা শিবির সরেজমিন পরিদর্শন করেন।
এমন সময় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে দ্রুত প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে মিয়ানমারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সৃষ্টির আবেদন করা হয়। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়েরের নেতৃত্বে একদল রোহিঙ্গা আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জিয়ার হাতে প্রত্যাবাসন-সংক্রান্ত একটি আবেদন দেন।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বুধবার সকালে প্রতিনিধি দলটি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে গিয়ে এই সংকটের বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে এ ইস্যুতে বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় যে বৈঠক করছে এবং স্বল্পপরিসরে পাইলট প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দল এ বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করছেন।
কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনকালে ক্যাম্পে আশ্রিত একদল রোহিঙ্গার সঙ্গে বৈঠক করেন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। এ সময় রোহিঙ্গারা জানান, বাংলাদেশের প্রতি তারা কৃতজ্ঞ। তবে ক্যাম্পে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন খুনোখুনি হচ্ছে, তাই তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। আর এখানে যথেষ্ট শিক্ষাব্যবস্থা নেই। এই জীবন তাদের কাছে বন্দি মনে হয়। যত দ্রুত সম্ভব তারা নিজ মাতভূমিতে ফিরে যেতে চান। প্রত্যাবাসনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র যেন মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে, সেই প্রত্যাশা তাদের।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা একটি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে বুধবার সকাল ৯টায় কক্সবাজার পৌঁছান। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন দেশটির পররাষ্ট্র দফতরের নাগরিক নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রবিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি উজরা জিয়া। এ ছাড়াও ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু, ঢাকায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত পিটার হাস ও দক্ষিণ এশিয়ার শরণার্থীবিষয়ক সমন্বয়কারী ম্যাককেঞ্জি রোয়েসহ ১০ সদস্য।
সকালে কক্সবাজার পৌঁছে সড়কপথে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যান প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে উখিয়ার বালুখালী ৯ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৌঁছান তারা। সেখানে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের (ইউএনএইচসিআর) রোহিঙ্গা তথ্য হালনাগাদ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এরপর তারা হেঁটে একে একে পুষ্টিকেন্দ্র, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। তারপর ১১ নম্বর ক্যাম্পের কমিউনিটি সেন্টারে যান উজরার নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিরা।
সেখানে একদল রোহিঙ্গা নারী-পুরুষের সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেন তারা। বৈঠকে ১০ জন রোহিঙ্গা নারী ও ১০ জন পুরুষ উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে রোহিঙ্গাদের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ১১ নম্বর ক্যাম্পে আশ্রিত মোহাম্মদ ইসমাইল। তিনি জানান, প্রতিনিধি দলটি ক্যাম্পের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। তাদের জানানো হয়, শিক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। উচ্চশিক্ষার সুযোগ নেই। তবে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে।
মো. ইউসুফ নামে আরেক রোহিঙ্গা জানান, প্রতিনিধিরা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে রোহিঙ্গাদের মতামত জানতে চেয়েছেন। ক্যাম্পে আশ্রিত জীবনকে বন্দিজীবন হিসেবে দেখছেন রোহিঙ্গারা। দ্রুত সময়ের মধ্যে তারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে চান। এ জন্য মিয়ানমারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক মহল যেন চাপ প্রয়োগ করে, এ নিয়ে প্রতিনিধিদের কাছে অনুরোধ করা হয়।
ক্যাম্পে খাদ্য সহায়তা কমিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে প্রতিনিধি দলের কাছে আপত্তি জানানো হয়েছে বলে জানান মোহাম্মদ ইদ্রিস নামে একজন। তাদের দাবি ছিল, খাদ্য সহায়তা যেন আগের মতো আবার দেওয়া হয়।
রোহিঙ্গাদের সব দাবি শুনেছেন প্রতিনিধিরা। এর সমাধানে রোহিঙ্গাদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলে জানান আশ্রিত রোহিঙ্গা ছৈয়দ নুর।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বৈঠক ছাড়াও প্রতিনিধি দলের সঙ্গে কথা বলতে তৎপরতা চালায় আরেক দল রোহিঙ্গা। তাদের নেতৃত্ব দেন রোহিঙ্গাদের সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের। দীর্ঘ সময় পর প্রতিনিধি দলের সঙ্গে তারা কথা বলার সুযোগ পান। এ সময় উজরা জিয়াকে একটি চিঠি দেন তারা।
মোহাম্মদ জোবায়ের জানান, চিঠিতে বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতার বিষয়টি জানানো হয়েছে। এ ছাড়া দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বদেশে প্রত্যাবাসনসহ রোহিঙ্গাদের নানা দাবি তুলে ধরা হয়। এদিকে মার্কিন প্রতিনিধি দলের সফর ঘিরে ক্যাম্প এলাকাজুড়ে গোয়েন্দা নজরদারিসহ জোরদার করা হয় কড়া নিরাপত্তা। প্রতিটি ক্যাম্পের প্রবেশমুখে চলে তল্লাশি, সতর্ক অবস্থানে ছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
এপিবিএন-৮-এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (মিডিয়া) ফারুক আহমেদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের এ সফরকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে নেওয়া হয় বাড়তি সতর্কতা।
ক্যাম্পে কার্যক্রম শেষ করে কক্সবাজার শহরে ফিরে যান যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা। কক্সবাজারে কর্মরত আন্তর্জাতিক সংস্থা, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বুধবার বিকালে তাদের বৈঠক হয়। এরপর ঢাকা ফেরেন তারা।
ঢাকায় মূল বৈঠক আজ
সফরসূচি অনুযায়ী বাংলাদেশ সফররত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের সফরের মূল বৈঠক হবে আজ বৃহস্পতিবার। সকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন তারা। একই দিন আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও বৈঠক করবেন। প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের সঙ্গেও বৃহস্পতিবার বৈঠক করবেন এবং প্রতিনিধি দলের সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করেছেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা। প্রতিনিধি দলের সঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের মূল বৈঠকও রাষ্ট্রীয় একটি অতিথি ভবনে হবে আজ। তাদের সম্মানে দুপুরে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেছেন পররাষ্ট্র সচিব। এর বাইরে শ্রম ও মানবাধিকার ইস্যুতে দুইটি সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠকসহ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, সম্পাদক ও গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করবে সফররত মার্কিন প্রতিনিধি দল।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ শাহজাহান বিশ্বাস
অফিস : আরিচা, শিবালয়, মানিকগঞ্জ-১৮০০
মোবাইল : +৮৮০ ১৭১১ ৭৩৩ ৬৫১, ই-মেইল : sbnews74@gmail.com