অনলাইন ডেস্ক: আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যারা আমাদের বাড়িতে সব সময় ওঠা-বসা, খাওয়া-দাওয়া করতো তারাই বেঈমানি করেছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। সেই বেঈমান-খুনিদের পুরস্কৃত করেছে জিয়াউর রহমান।
তিনি বলেন, জাতির পিতাকে হত্যা করে সংবিধান না মেনে খুনি মোশতাক নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে। রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেই জিয়াউর রহমানকে বানাল সেনাপ্রধান। ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জিয়াউর রহমান ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলো। মীর জাফর বেইমানি করে তিন মাসও ক্ষমতায় থাকতে পারেনি, দুই মাসের মাথায় তাকে চলে যেতে হয়েছিল। একই ঘটনা বাংলাদেশে ঘটেছে। মোশতাককে বিদায় আর জিয়াউর রহমান নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা দিয়ে ক্ষমতায় বসে। সেনাপ্রধান আবার রাষ্ট্রপতি, সংবিধান লঙ্ঘন করে, সেনা আইন লঙ্ঘন করে। এরপরই সংবিধান সংশোধন করে তাদের বিচার হবে না বলে আইন পাস করেছে। খুনিদের বিচারের পথ বন্ধ করে পুরস্কৃত করেছে, তাদের চাকরি দিয়েছে, অর্থ দিয়েছে, সম্পদ দিয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর জয় বাংলা স্লোগান ও ৭ মার্চের ভাষণ নিষিদ্ধ করা হয়।
বুধবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।
জিয়ার পর এরশাদও একই কাজ করেছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি খুনি ফারুক-রশীদদের রাজনৈতিক দল করার সুযোগ দেন। ১৯৮৮ সালে এরশাদ যে নির্বাচন করে, ওই নির্বাচনে ফারুককে রাষ্ট্রপতি পদ দেওয়ার প্রস্তা দেয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঘাতকরা ইতিহাস বিকৃত করে। যে জয় বাংলা স্লোগানে দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, সেই স্লোগান নিষিদ্ধ করে দেয়। খুনিরা বঙ্গবন্ধুর হত্যার সঙ্গে বাংলাদেশের নাম পরিবর্তন করে ফেলে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেয়। বাংলাদেশ বেতারের নাম পরিবর্তন করে রেডিও বাংলাদেশ করে। জয়বাংলা স্লোগান বাদ দিয়ে জিন্দাবাদ স্লোগান নিয়ে আসে। ইতিহাসই বিকৃতি করে। বাংলাদেশের মানুষের উন্নতির সব স্বপ্ন বন্ধ হয়ে যায়। ইতিহাস কখনো মুছে ফেলা যায় না। এটাই বাস্তবতা। ভেবেছিল কোনোদিন এ হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে না। আমি কৃতজ্ঞতা জানাই এ দেশের মানুষকে। ২১ বছর পর তাদের সমর্থনে ক্ষমতায় এসে সেই বিচারের উদ্যোগ নিই। ৩৫ বছর সময় লেগেছে বিচার পেতে। কিছু খুনির রায় কার্যকর হয়েছে।
তিনি বলেন, ১৫ আগস্ট বাঙালির জাতীয় জীবনে সবচেয়ে একটি কলঙ্কময় অধ্যায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছিল ১৫ আগস্ট। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নির্মমভাবে হত্যা করা হয় বাঙালির জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। একই সঙ্গে আমার মা, আমার তিন ভাই, কামাল-জামালের বউদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে। ইতিহাসের এ জঘন্য ঘটনা বাংলার মাটিতে ঘটে যায়। সেই কারবালার ঘটনাকেও যেন হার মানায়। কারবালার ঘটনা শিশু-নারীদের হত্যা করা হয়নি, কিন্তু ১৫ আগস্ট শিশু-নারীদেরও তারা ছাড়েনি। আমি আর আমার ছোট বোন রেহানা মাত্র ১৫ দিন আগে ৩০ জুলাই জার্মানির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে ৩১ জুলাই আমরা সেখানে পৌঁছাই। আমরা ভাবতেও পারিনি আমাদের জীবনে এমন একটা আঘাত অপেক্ষা করছে। ১৩ তারিখে আব্বার সঙ্গে, মায়ের সঙ্গে, সবার সঙ্গে কথা হয়। ১৫ তারিখে এ ঘটনা ঘটার পর যখন আমরা জানতে পারি, তখন সব তথ্য আমরা জানতে পারিনি। আমার আপনজন হারিয়েছি, স্বজন হারিয়েছি, বিদেশে রিফিউজি হিসেবে থাকতে হয়েছে। আমরা যারা আপনজন হারিয়েছি, আমারও তো হারিয়েছি, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বাংলাদেশে কী হারিয়েছিল? বাংলাদেশের মানুষ কী হারিয়েছিল? আমার বাবা সারাটা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন এদেশে মানুষের জন্য। মানুষের কথাই বেশি ভাবতেন। তিনিতো ভালোবেসেছিলেন মানুষকে। এদেশে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করবেন। তাদের সুখী জীবন দেবেন। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করে তাদের উন্নত জীবন দেবেন। সেটাইতো তার জীবনের একমাত্র সাধনা ও সংগ্রাম। কাজেই তিনি নিজের জীবনকে সেভাবে উৎসর্গ করে গেছেন। বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তুলেছিলেন।
জিয়াউর রহমান মানুষের ভোট, ভাত ও কথা বলার অধিকার কেড়ে নিয়েছিল উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, তখন মতপ্রকাশের কোনো স্বাধীনতা ছিল না। একটা মাত্র রেডিও ও হাতে গোনা কয়েকটি পত্রিকা সব তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ক্ষমতায় এসে সেনাবাহিনীর হাজার সৈনিককে নির্মমভাবে হত্যা করেছে জিয়াউর রহমান। একটা করে ক্যু করেছে, আর হত্যা করেছে। তাদের বিচারও হয়নি। সরাসরি ফাঁসি হয়েছে। এমনও দিন গেছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে একই সঙ্গে ১০ জন করে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। সারা দেশের কারাগারে এমন হয়েছে। সবাইকে যে ফাঁসি দিয়েছে এমন নয়, কাউকে কাউকে ফায়ারিং স্কোয়াডে নিয়ে গুলি করে হত্যা করেছে। উর্দি পরে ক্ষমতায় বসে নিজেকে রাজনীতিবিদ বানানোর চেষ্টা করেন জিয়া। তিনি হ্যাঁ-না ভোট দিয়ে নির্বাচন দেন। সংবিধান স্থগিত করে তিনি ওই নির্বাচন করেন। ভোট কারচুপি, ভোট চুরি তো তখন থেকেই শুরু। এরপর বিএনপি নামে দল গঠন করেন জিয়া।
বিদেশি প্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা পছন্দ করে না বলেই তারা নির্বাচন নিয়ে খুব বেশি উতলা। এখন নির্বাচন নিয়ে অনেকে উতলা হয়েছে। তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, ২০০১ সালে যখন আমাদের নেতাকর্মীদের নির্যাতন করেছে, তখনতো নির্বাচন নিয়ে তাদের এত মাথাব্যথা ছিল না। ৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার বিতর্কিত নির্বাচন নিয়ে তো তাদের এমন চেতনা দেখিনি। খালেদা জিয়া ভুয়া ভোটার নিয়েও তো তাদের কোনো উদ্বেগ দেখিনি। এ দেশের যারা ধ্বংসযজ্ঞ চালালো, তাদের সঙ্গে বসতে হবে কেন? আমার মনে হয়, বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা তাদের পছন্দ না। এদের উদ্দেশ্য, নির্বাচন বা গণতন্ত্র না। এরা উন্নয়নের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে চায়।
আমেরিকাসহ কয়েকটি দেশের দিকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গোপসাগরকে ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশে আক্রমণ করা, এটাই কারো কারো উদ্দেশ্য। সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চায়। আজকে তারা গণতন্ত্রের কথা বলেন। আমি তাদের ওখানে (যুক্তরাষ্ট্র) দেখেছি, গভর্নমেন্ট অব দ্যা পিপল, বাই দ্যা পিপল, ফর দ্যা পিপল। তাদের বলেছি-আমি এমন দেশ (বাংলাদেশ) থেকে এসেছি, যেখানে গভর্নমেন্ট অব দ্যা আর্মি, বাই দ্যা আর্মি, ফর দ্যা আর্মি। ভারত মহাসাগর এবং বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে নানা রকম চক্রান্ত আছে। অনেকে এটিকে ব্যবহার করতে চায়। আর এখানে বসে আশপাশে আক্রমণ করবে। আমাদের কিছু আতেল আছে। তারা এসব চিন্তা করে কি না জানি না। কিছু উপলব্ধি না করেই দুটো পয়সার পাওয়ার আশায় এদের সঙ্গে সূর মিলায়। এ বিষয়ে আমাদের সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। আর আগেও গ্যাস বিক্রির কথা আসছিল, আমি বলেছিলাম- দেশের স্বার্থ বেঁচে ক্ষমতায় আসতে হবে, এত ক্ষমতালোভী আমি না। আমার বাবাও এমন ছিলেন না।
ড. ইউনূসেরও সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের দেশের একজন কুলাঙ্গার সুদখোর আছে। শ্রমিকের অর্থ মেরে খায়। ট্যাক্স দেয়নি। গরিব থেকে উচ্চ সুদে টাকা নিয়ে মেরে দিয়ে বিদেশে পাচার করে। এটাই তো কথা। উনি তাদের প্রিয় ব্যক্তি। আর আমরা কাজ করি, মানুষের কল্যাণে।
খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ৯১ সালে ক্ষমতায় আসার পর তার (খালেদা জিয়া) আসল রূপ বেরোলো। ১৫ আগস্ট মিথ্যা জন্মদিন পালন শুরু করলো। জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিয়ের সময় জন্ম তারিখ ১৫ আগস্ট উল্লেখ করেননি। সার্টিফিকেটেও নেই। এমনকি ফাস্ট লেডি হিসেবে সে যে পাসপোর্ট করেছেন, সেখানে ১৫ আগস্ট জন্মদিন ছিল না। ক্ষমতায় আসার পর মিথ্যা উৎসব শুরু করেছে জঘন্য হত্যাকাণ্ডের দিন। কত জঘন্য এটা! আজকে তাদের কাছে মানবাধিকারের কথা শুনতে হয়। মানবাধিকার সে সময় কোথায় ছিল?
বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও নির্বাচন নিয়ে তৎপর দেশগুলোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এদের উদ্দেশ্য গণতন্ত্র না, এরা একটা জিনিসই করতে চায়। আজকে যে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভিত্তিটা আমরা মজবুত করেছি, জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করেছি, বাংলাদেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নতি হচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষ আজকে এগিয়ে যাচ্ছে উন্নয়নের পথে, আজকে দারিদ্র্যের হার আমরা ৪১ থেকে ১৮ ভাগে নামিয়ে এনেছি। হতদরিদ্র যেটা ২৫ ভাগ ছিল, সেটাকে আমরা ৫ দশমিক ৭ ভাগে নামিয়ে এনেছি। , বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে এরা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে চায়।
পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্তির সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই এলাকাটা নিয়ে নানা ধরনের খেলার একটা চক্রান্ত। পার্বত্য চট্টগ্রামে ২০ বছর ধরে যেখানে সংঘাত ছিল, আমি সরকারে আসার পর সেখানে শান্তি ফিরিয়ে আনি। সেখানেও আবার নানা রকম অশান্তি সৃষ্টির প্রচেষ্টা।
এ আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্যে রাখেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। সভায় আরও বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি, সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন, কার্যনির্বাহী সদস্য তারানা হালিম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. হুমায়ুন কবির, উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম মান্নান কচি প্রমুখ। সভা পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক ড. আব্দুস সোবহান গোলাপ ও উপ-প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল আউয়াল শামীম।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ শাহজাহান বিশ্বাস
অফিস : আরিচা, শিবালয়, মানিকগঞ্জ-১৮০০
মোবাইল : +৮৮০ ১৭১১ ৭৩৩ ৬৫১, ই-মেইল : sbnews74@gmail.com